অর্থনীতি

বাংলাদেশের পণ্য যাবে মিয়ানমারে, ডলার আসবে সিঙ্গাপুর থেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ৩:৩০ রাত
বাংলাদেশের পণ্য যাবে মিয়ানমারে, ডলার আসবে সিঙ্গাপুর থেকে
ছবি: প্রথম আলো

যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে যুদ্ধজনিত নিরাপত্তাঝুঁকি ও ডলার-সংকটে দেশটির ব্যবসায়ীরা সরাসরি মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন না; তাই তাঁরা বাংলাদেশি পণ্যের দাম মেটাতে চান তৃতীয় কোনো দেশ থেকে।

এদিকে মিয়ানমারে রপ্তানি হওয়া পণ্যের দাম তৃতীয় দেশ থেকে আনার অনুমতি চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) আবেদন করেছে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদনটি অনুমোদন করা হবে।

জানা গেছে, ‘এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুড’ নামের প্রতিষ্ঠানটি গত জুলাই মাসে এই আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট, আলু ও ওষুধ আমদানিতে আগ্রহী; কিন্তু সেখানে যুদ্ধপরিস্থিতিতে নিরাপত্তাঝুঁকি ও ডলার-সংকট থাকায় সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন না তাঁরা। তাই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড কিংবা দুবাই থেকে দাম পরিশোধ করতে চান।

বাংলাদেশের পণ্য মিয়ানমারে যায় টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়েই।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধে মিয়ানমারের অনেক সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সড়ক যোগাযোগও হয়ে পড়েছে নিরাপত্তাহীন। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় বেড়েছে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা।

এ ওয়ান ফিশ অ্যান্ড মেরিন ফুডের মালিক এম ডি আলম বলেন, মিয়ানমারে সিমেন্ট কারখানা কম, তাই সেখানে সিমেন্টের চাহিদা অনেক। কিন্তু প্রয়োজনীয় এনওসি ও অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশি আলু ও বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস রপ্তানিরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

কীভাবে মিলবে অনুমোদন

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আবেদনটি প্রথমে নিজেরা পর্যালোচনা করেছেন তাঁরা, এরপর আলোচনা করেছেন ব্যাংক খাতের সঙ্গে। যেহেতু মূল লক্ষ্য রপ্তানি সহজ করা, তাই অনুমোদনের সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে; শিগগিরই তা জানানো হবে।

সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৃতীয় দেশ থেকে রপ্তানি আয় আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বাধা নেই; বৈদেশিক মুদ্রা আয় সহজ করতেই আবেদনটির অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রজ্ঞাপনেও এমন সুযোগের বিধান রয়েছে। ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রা বিভাগ থেকে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে ভিন্ন কোনো দেশ থেকেও রপ্তানিমূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

তবে অনুমোদনের বিষয়টি রোববার পর্যন্ত টেকনাফ শুল্ক স্টেশনে পৌঁছায়নি; ফলে রপ্তানির অপেক্ষায় রয়েছেন এম ডি আলম। তিনি বলেন, ‘বিদেশি মুদ্রা আয়ের এমন সুযোগের জন্যও ঘুরতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়।’

এদিকে মিয়ানমারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে ৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ; আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। রপ্তানি পণ্যের তালিকায় সিমেন্ট ও আলুর পাশাপাশি ছিল ইয়ার্ন ও পাটপণ্যও।

ব্যবসা কমেছে, জেগেছে নতুন আশা

মিয়ানমারের সঙ্গে পণ্য রপ্তানি-আমদানিতে যুক্ত রয়েছেন শতাধিক ব্যবসায়ী। চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় চীন এই করিডর গঠনের প্রস্তাব দেওয়ায় এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হওয়ায় বাণিজ্য সম্ভাবনার কথা ভাবছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি এস এম নুরুল হক বলেন, রোহিঙ্গা আগমনের পর দুই দেশের বাণিজ্য কমে নেমে এসেছে আগের প্রায় ২৫ শতাংশে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হলে ব্যবসা আবার গতি পাবে। নতুন করিডর হলে সরাসরি চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সঙ্গেও পণ্য বিনিময় করা যাবে, আর লিড টাইম ১০ দিন থেকে নেমে আসবে ১ দিনে।

মিয়ানমারে পণ্য পাঠিয়ে অন্য দেশ থেকে দাম পাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশটির অনেক ধনী ব্যবসায়ী থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন; তাই সেসব দেশ থেকে বিল পরিশোধ করতে পারেন তাঁরা — আন্তর্জাতিক নিয়মেই এটি সম্ভব। যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারে ডলার-সংকটের পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে গেছে; আগে সেখানে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থাকলেও এখন তা-ও নেই। বাংলাদেশের ওষুধ মিয়ানমারের বাজারে বেশ জনপ্রিয় বলেও জানান তিনি।

কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মুর্শেদ বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সিমেন্ট রপ্তানিতে কিছুটা কঠোরতা রয়েছে — কারণ এসব সিমেন্ট দিয়ে আরাকান আর্মি বাংকার তৈরি করতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে।

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত, বেড়েছে লোডশেডিং

৬২ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত, বেড়েছে লোডশেডিং