সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে যেদিন মুকুট উঠেছিল মাথায়, বয়স তখন মোটে ২১। সেদিনের সেই তরুণী হয়তো জানতেন না, একটা মুকুট তাঁকে আলোয় এনে দাঁড় করাবে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোয় টিকে থাকার লড়াইটা হবে আরও কঠিন। নেহা ধুপিয়ার ক্যারিয়ারের গল্প তাই নিছক এক সুন্দরী প্রতিযোগিতার বিজয়ীর বলিউডে পা রাখার গল্প নয়; বরং বারবার নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ার গল্প।
আজ ২৭ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। ১৯৮০ সালের এই দিনে ভারতের কোচিতে জন্ম নেহার। বাবা ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়ায় ছোটবেলা কেটেছে শৃঙ্খলার ছকে বাঁধা পরিবেশে। পরে দিল্লির জেসাস অ্যান্ড মেরি কলেজ থেকে পড়েছেন ইতিহাস। অভিনয় ও মডেলিংয়ে আসার আগে কাজ করেছেন ছোট পর্দা ও মঞ্চেও। শিশুশিল্পী হিসেবে মালয়ালম ছবি ‘মিন্নারাম’-এও দেখা গিয়েছিল তাঁকে।
যে মুকুট বদলে দিয়েছিল জীবন
সালটা ২০০২। ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ফেমিনা মিস ইন্ডিয়ায় অংশ নিয়ে ‘মিস ইন্ডিয়া ইউনিভার্স’ খেতাব জিতে নেন নেহা। ২৬ প্রতিযোগীর মধ্য থেকে চূড়ান্ত বিজয়ী হন তিনি। একই প্রতিযোগিতায় শ্রুতি শর্মা পান মিস ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ড আর রেশমি ঘোষ পান মিস ইন্ডিয়া আর্থের মুকুট।
তবে কেবল সৌন্দর্যেই নয়, প্রশ্নোত্তর পর্বেও নজর কেড়েছিলেন তিনি। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সেই সময়ে তাঁর প্রশ্নটি ছিল—সীমান্তের বিভাজন ভুলে মানুষ হিসেবে কেন শান্তিতে বসবাস করা যাবে না? সেই উত্তরই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।
এরপর মিস ইউনিভার্স ২০০২-এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে সেরা দশে জায়গা করে নেন নেহা। মুকুট জয়ের পর রাতারাতি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু সামনে তখন আরও বড় পরীক্ষা—বলিউড।
‘জুলি’ দিয়ে আলোচনা
২০০৩ সালে ‘কায়ামত: সিটি আন্ডার থ্রেট’ দিয়ে হিন্দি ছবিতে অভিষেক হয় নেহার। প্রথম ছবিতেই নজরে আসেন তিনি, তবে ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে যায় ২০০৪ সালের ‘জুলি’তে। সাহসী চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন, একই সঙ্গে জুটে যায় ‘সেক্স সিম্বল’ তকমাটিও।
মুশকিল হলো, যে পরিচিতি তাঁকে জনপ্রিয় করেছিল, পরে সেটিই হয়ে দাঁড়ায় এক ধরনের খাঁচা।
নেহা নিজেই বহুবার বলেছেন, ‘জুলি’র পর তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচের চরিত্রে আটকে ফেলা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ছবিটির পোস্টার ও প্রচারণার কারণেই তাঁকে ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে দেখা শুরু হয়; অথচ তিনি কাজ করতে চেয়েছিলেন ভিন্ন ধরনের চরিত্রে। ‘ক্যা কুল হ্যায় হাম’-এর মতো ছবিতে কাজের সিদ্ধান্তটিও পরে তাঁর ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
নেহার ভাষায়, ‘জুলি’ তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে করেছিল টাইপকাস্টও। তাই সচেতনভাবেই ধীরে ধীরে অন্য ধরনের ছবির দিকে সরে যেতে থাকেন তিনি।
‘সেক্সি’ শব্দটাই অপছন্দ ছিল
বলিউডে নেহার শুরুটা ছিল পুরোপুরি গ্ল্যামারনির্ভর। কিন্তু ক্যারিয়ার যত এগিয়েছে, ততই সেই পরিচয়ের বাইরে যেতে চেয়েছেন তিনি।
‘এক চাল্লিশ কি লাস্ট লোকাল’, ‘মিথ্যা’, ‘দাসবিদানিয়া’, ‘ফাস গয়ে রে ওবামা’র মতো ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। বড় বাজেটের মূলধারার ছবির পাশাপাশি বেছে নিয়েছেন তুলনামূলক ছোট ও বিষয়নির্ভর সিনেমাও। ২০১৭ সালে ‘হিন্দি মিডিয়াম’, ‘ক্যারিব ক্যারিব সিঙ্গেল’ আর ‘তুমহারি সুলু’র মতো ছবিতে কাজ করে অভিনয়ের জায়গায় নিজের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পান আবার।
এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেছিলেন, ক্যারিয়ারের শুরুতে পাওয়া ‘সেক্সি’ তকমাটি তাঁর পছন্দ ছিল না। সেই পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতেই ভিন্ন ধরনের চরিত্র বেছে নিতে শুরু করেন তিনি।
‘তুমহারি সুলু’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। ছবিতে বিদ্যা বালানের সঙ্গে কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। নেহার নিজের কাছেও ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এটিই তাঁকে আবার অভিনয়ের স্বীকৃতি এনে দেয়।
কাজ কমেছে, কিন্তু থামেননি
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, একটা সময় নেহা বলিউড থেকে সরে গিয়েছিলেন। আসলে তিনি সরে যাননি, বদলে ফেলেছিলেন কাজের ধরনটাই।
২০১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, কাজ না থাকলে ঘরে বসে থাকার মানুষ তিনি নন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশন, রিয়েলিটি শো, অনুষ্ঠান সঞ্চালনা, ডিজিটাল কনটেন্ট—নানা মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। তাঁর দর্শনটি ছিল সহজ: কাজ না থাকলে নিজের কাজ নিজেকেই বানিয়ে নিতে হবে।
এভাবেই তাঁর ক্যারিয়ারে আসে ‘নো ফিল্টার নেহা’। পডকাস্ট ও চ্যাট শোর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় তাঁর নতুন এক পরিচয়। অভিনয়ের বাইরে তাঁর স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্বও তখন জনপ্রিয় হতে শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
২০১৮ সালে অভিনেতা অঙ্গদ বেদির সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর, একই বছর জন্ম নেয় তাঁদের কন্যা মেহের। এরপরই নেহার সামনে হাজির হয় আরেক বাস্তবতা—মাতৃত্বের পর একজন অভিনেত্রীর কাজ পাওয়া কতটা কঠিন।
মা হওয়ার পর বন্ধ হলো কাজের দরজা
‘তুমহারি সুলু’র পর আরও ভালো চরিত্র পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল নেহার। কিন্তু সন্তান জন্মের পর তাঁর দাবি, বলিউড থেকে প্রায় কোনো ছবির প্রস্তাবই আসেনি।
২০১৯ সালে তিনি জানান, মা হওয়ার পর ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে গিয়েছিল। শুধু কাজের অভাব নয়, সন্তান জন্মের পর শরীর নিয়েও কটাক্ষের মুখে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—সদ্য মা হওয়া একজন নারীকে ওজন নিয়ে হেনস্তা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তখন অপেক্ষায় না থেকে নিজের কাজের ক্ষেত্রটাই নিজে বাড়িয়ে নেন তিনি। টেলিভিশন, পডকাস্ট, অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থান তৈরি করেন, যেখানে তাঁর ক্যারিয়ার আর কেবল সিনেমার ওপর নির্ভরশীল থাকে না।
‘রোডিজ’ বিতর্কে ঝড়
নেহার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটির জন্ম ‘রোডিজ রেভোল্যুশন’ থেকে।
২০২০ সালে এক প্রতিযোগী জানান, তাঁর প্রেমিকা আরও পাঁচজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে তিনি তাঁকে চড় মেরেছেন। তীব্র প্রতিক্রিয়ায় নেহা বলেন, একজন নারী সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেবেন সেটি তাঁর নিজের বিষয়; কিন্তু তাঁকে মারার অধিকার কোনো পুরুষেরই নেই।
এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। অনেকে তাঁকে ‘ফেক ফেমিনিস্ট’ বলে কটাক্ষ করেন, তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ ছড়িয়ে পড়ে ভাইরাল হয়ে। সমালোচনার বড় কারণ ছিল—অনেকে ধরে নিয়েছিলেন, তিনি প্রতারণাকেই সমর্থন করছেন।
নেহা পরে বিষয়টি স্পষ্ট করেন—তিনি প্রতারণাকে সমর্থন করেননি, তাঁর আপত্তি ছিল শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে। তাঁর কথায়, সম্পর্কে প্রতারণা নৈতিকতার প্রশ্ন হতে পারে, কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই শারীরিক নির্যাতন গ্রহণযোগ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
বিতর্ক এতটাই বেড়েছিল যে তাঁর পরিবার, এমনকি তাঁর মেয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাতেও কটূক্তি শুরু হয় বলে জানান নেহা। স্ত্রীর পাশে প্রকাশ্যেই দাঁড়ান তাঁর স্বামী অঙ্গদ বেদি।
এর আগেও ‘রোডিজ’-এ নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সরব হয়েছিলেন তিনি। অডিশনে এক প্রতিযোগীর আচরণে অস্বস্তি বোধ করে তাঁকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখনো তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনো নারী যদি কোথাও নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, সেই জায়গায় কথা বলার অধিকার তাঁর আছে।
সরে যাওয়া নয়, অন্য পথে যাত্রা
নেহার ক্যারিয়ারে এমন সময় এসেছে, যখন বড় পর্দায় তাঁকে খুব একটা দেখা যায়নি। কিন্তু কাজ তিনি তখনো করে গেছেন। ২০১৮ সালে নিজেই বলেছিলেন, খুব বেছে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ; কারণ দীর্ঘদিন পর্দার বাইরে থাকলে দর্শকের চোখ থেকেও সরে যেতে হয়। তাই সিনেমার পাশাপাশি অন্য প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকাটা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
২০২৪ সালে তিনি আরও খোলাখুলি বলেন, হিন্দি ছবিতে নিজের পছন্দের কাজ খুঁজে পেতে তাঁকে ২২ বছর ধরে লড়াই করতে হয়েছে। ‘মিথ্যা’, ‘এক চাল্লিশ কি লাস্ট লোকাল’, ‘ফাস গয়ে রে ওবামা’, ‘আ থার্সডে’—নানা ধরনের কাজের ভেতর দিয়ে নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করে গেছেন তিনি।
নেহা জানান, ২৩ কেজি ওজন কমানোর পরও এবং আগে ভালো কাজ করার পরও পছন্দের চরিত্র মিলছে না তাঁর। তাঁর বক্তব্য, অভিনেতাকে কাজের জন্য বসে থাকলে চলবে না—কাজ চাইতে হবে, নিজের সুযোগ নিজেকেই তৈরি করতে হবে।
এখন আর ‘প্ল্যান বি’ নয়
নেহার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা সম্ভবত এখানেই। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে দুই দশকের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, একসময় ভাবতেন—বলিউড যদি না হয়, তাহলে কী করবেন? অর্থাৎ অভিনয়কে তখনো তিনি নিজের ‘প্ল্যান এ’ হিসেবে পুরোপুরি নিশ্চিত ভাবতে পারতেন না।
কিন্তু এখন ভাবনাটা বদলেছে। সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, রিয়েলিটি শো, পডকাস্ট, সঞ্চালনা, লাইভ অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে তিনি বুঝে গেছেন, বিনোদন জগতেই তাঁর জায়গা। তাই এখন আর নিজেকে ‘শীর্ষে আছি কি না’ সেই হিসাবে বিচার করেন না; বরং এই খেলায় টিকে থাকাটাকেই মনে করেন বড় অর্জন।
সম্প্রতি ‘৫২ ব্লু’ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তাঁর এখনকার আত্মবিশ্বাসটা ধরা পড়ে একটি কথাতেই—এত বছর টিকে থাকার মানে, নিশ্চয়ই তিনি কিছু একটা ঠিকঠাক করেছেন। আর সে কারণেই এখনই কোথাও চলে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই তাঁর।
ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়াডটকম অবলম্বনে