নাটকের অভিনয় নিয়ে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই তানজিম সাইয়ারা তটিনীর। এরই মধ্যে মোস্তফা কামাল রাজ পরিচালিত ‘পথহারা মন’ নাটকে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। নাটকটি দেখা যাচ্ছে অ্যামাজন প্রাইমেও। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন এই অভিনয়শিল্পী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের।
ফোন বন্ধ ছিল কেন
কথা শুরুর আগেই জানা গেল, মঙ্গলবার ভোরে ঘুমিয়েছেন তিনি। ‘আমার হয়ে থেকো’ (নাম বদল হতে পারে) নাটকের শুটিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেজে গিয়েছিল রাত চারটা। তাই ফোনের নেট বন্ধ রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
দর্শক কোন তটিনীকে দেখতে চান
নিয়মিত কাজ করছেন—দর্শক এখন কোন ধরনের নাটক পছন্দ করছেন? তটিনীর পর্যবেক্ষণ, যা-ই করুন না কেন, তাঁর রোমান্টিক কাজগুলোই মানুষ বেশি পছন্দ করে। গত এক বছরে ‘তোমাদের গল্প’ প্রচারের পর থেকে দর্শক তাঁকে একটু চটপটে চরিত্রে দেখতেই বেশি আগ্রহী। তার আগে অনেকের ধারণা ছিল, তিনি চুপচাপ, শান্ত ধরনের। ‘বেশি বলে বুলবুলি’ করার পর তাঁর মনে হয়েছে, চঞ্চল চরিত্রেও দর্শক তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন।
বাস্তবে তিনি কেমন? তটিনী বলেন, ‘আমি চুপচাপ; কিন্তু যাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভালো, তাদের সঙ্গে আমি আবার খুবই চঞ্চল। তবে বেশির ভাগ মানুষ আমাকে চুপচাপ হিসেবেই চেনে।’ পরিবারের কাছে তিনি ঠিক কেমন, সে প্রসঙ্গে হেসে জানালেন—সেটা পরিবারই ভালো বলতে পারবে, তাই সে কথা আর না-ই বা বললেন।
‘পথহারা মন’ কেন এত জনপ্রিয়
নাটকটির সাফল্যের পেছনে প্রথমেই গল্পকে কৃতিত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, ‘পথহারা মন’-এর গল্পের ভেতর মানুষ সহজেই নিজেদের খুঁজে পেয়েছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বিষয়—দীর্ঘদিন পর ফিকশনে অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান, যা দর্শকের মধ্যে আলাদা কৌতূহল আর আকর্ষণ তৈরি করেছে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে পরিচালকের উপস্থাপনাকেই সবচেয়ে বড় কারণ মনে করেন তটিনী। পারিবারিক গল্পের নাটক তো কম হচ্ছে না; ‘তোমাদের গল্প’-এর পর পারিবারিক ড্রামার একটা ট্রেন্ডই তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু সব গল্প যেভাবে বানাতে বা দেখতে চাওয়া হয়, সব সময় সেভাবে হয়ে ওঠে না। রাজের নিজস্ব একটা প্যাটার্ন আছে বলে মনে করেন তিনি—খুব সহজ, স্বাভাবিকভাবেই তিনি গল্পের সঙ্গে দর্শককে জুড়ে দিতে পারেন। এটিকেই এই নির্মাতার সবচেয়ে বড় শক্তি, এক অর্থে তাঁর ‘ম্যাজিক’ বলে বর্ণনা করেন তটিনী।
ধারাবাহিকে কি নিয়মিত হবেন
‘তোমাদের গল্প’-এর পর এবার ‘ফিরে আসার গল্প’—ধারাবাহিকে কি থিতু হচ্ছেন? তটিনী মনে করিয়ে দেন, তাঁর শুরুটাই তো হয়েছিল ধারাবাহিক দিয়ে। তবে সত্যি বলতে খানিকটা ভয়ও কাজ করে তাঁর মধ্যে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আবার ধারাবাহিকে ফেরা—এটা তাঁর জন্য নতুন অভিজ্ঞতাই বটে।
তবু নির্মাতা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ওপর আস্থা রাখছেন তিনি। তাঁর নির্মাণ পছন্দ করেন বলেই তাঁর সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান আর কৃতজ্ঞ মনে করছেন। সিনেমাওয়ালার মতো একটি প্ল্যাটফর্মে বিপুলসংখ্যক দর্শক আছেন—এত বড় জায়গায় নিজের অভিনয় দেখানোর সুযোগ সবাই পান না বলেই মনে করেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, পরিচালক সেই সুযোগটা করে দেবেন, আর তিনিও নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। ধারাবাহিকে ভবিষ্যতে নিয়মিত হবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিচ্ছেন সময়ের হাতেই।
জুটি কি সত্যিই কাজ করে
তটিনীর ভাষায়, জুটির ব্যাপারটা অনেকটাই আল্লাহ প্রদত্ত। কাকে কার সঙ্গে দর্শক জুটি হিসেবে দেখতে পছন্দ করবেন, তা আগেভাগে কারও বলার উপায় নেই। তবে জুটির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কিংবা ‘জুটি হলেই নাটক ভালো হবে’—এমন ধারণা তৈরি হলে অভিনয়ের জায়গাটা সংকুচিত হয়ে যেতে পারে বলেই তাঁর মত।
তিনি মনে করেন, গল্প ভালো হলে এবং সেটি সততা ও বিশ্বাস নিয়ে করা হলে বিপরীতে যিনিই থাকুন, দর্শক কাজটি পছন্দ করবেন। জুটি হয়তো কোনো কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়, কাজটাকে খানিকটা এগিয়েও দেয়; কিন্তু শেষ বিচারে ভালো কাজ ভালোই থাকে—সেটি যে জুটিই করুক না কেন।
পার্থ শেখের সঙ্গে নতুন জুটি?
অভিনয়শিল্পী পার্থ শেখের সঙ্গে একটি কাজ করেছেন, দর্শক তাঁদের জুটি পছন্দও করেছেন। তবে তাঁদের নিজেদের মনে হয়েছে, শুরুটা আরও শক্তিশালী কোনো গল্প দিয়ে কিংবা একটু ভিন্ন জনরার কিছু দিয়ে হলে হয়তো আরও ভালো হতো। তারপরও কাজটা ভালো হয়েছে, মানুষ পছন্দ করেছে—এটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় কথা।
ভালো গল্পে কাজ করতেই সব সময় আগ্রহী তিনি। নাটকের ভিউ কত হলো, সেটি তাঁর কাছে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। এখন প্রায়ই দেখা যায়, ইউটিউবে প্রকাশের এক দিনের মধ্যেই কোনো নাটকের দুই-তিন মিলিয়ন ভিউ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেবল ভিউ দিয়ে তো কাজের মান মাপা যায় না—গল্প, চরিত্র আর কাজটা কতটা যত্ন নিয়ে করা হলো, তাঁর কাছে এসবই বেশি জরুরি।
প্রিয় পাঁচ চরিত্র
খুব প্রিয় বলতে রাজি নন, তবে এ পর্যন্ত করা চরিত্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি তাঁর বেশ কাছের। সেই তালিকায় আছে ‘সুহাসিনী’র আলো, ‘তোমাদের গল্প’র শালু—যে চরিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারে একটি মাইলফলক তৈরি করেছে, ‘হৃদয়ের গভীরে’র রাহা, ‘সময় সব জানে’র ইরা এবং ‘কাজল চোখের মেয়ে’র কাজল। প্রতিটি চরিত্রই তাঁকে আলাদা কিছু দিয়েছে, অভিনয়শিল্পী হিসেবে নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দিয়েছে। সে কারণেই এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর আলাদা আবেগ আর ভালো লাগা।
বড় পর্দা নিয়ে ভাবনা
‘জয়া আর শারমিন’-এ ছোট একটি চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তবে বড় পর্দা নিয়ে এখনই আলাদা করে ভাবছেন না তটিনী। ভালো গল্প আর পছন্দের চরিত্র পেলে অবশ্যই বিবেচনা করবেন বলে জানান তিনি।
নাটকের কাজটাই তিনি দারুণ উপভোগ করেন। এখানে যে ধরনের চরিত্র আর গল্প নিয়ে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন, বড় পর্দায় এখন পর্যন্ত তেমনটা পাননি। আগেও কয়েকবার সিনেমার প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু কোনোটাই তাঁর কাছে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। সিনেমায় কাজের ক্ষেত্রে গল্প আর চরিত্রকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন তিনি, কারণ বড় পর্দায় ঝুঁকিটাও অনেক বেশি।
এমন কোনো কাজ তিনি করতে চান না, যা নিয়ে দর্শকের বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হবে অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁরা হতাশ হবেন। বরং তিনি চান এমন একটি কাজ করতে, যেটি দেখে মানুষ বলবে—তটিনীকে এই চরিত্রেই দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। তাঁর কথায়, ‘দর্শক আমার কাছে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছেন, সেটি যেন ভালো একটা কাজ দিয়ে পূরণ করতে পারি। আমি চাই না, মানুষ আশাহত হোক।’