আন্তর্জাতিক

৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহধস, আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়েই কি নেপালে এ দুর্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ৫:০০ ভোর
৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহধস, আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়েই কি নেপালে এ দুর্যোগ
ছবি: প্রথম আলো

তিব্বত সীমান্তঘেঁষা নেপালে গতকাল বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি হিমবাহের ধসই বড় কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ধারণা, হিমবাহের নিচের বড় একটি অংশ ভেঙে শত শত মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ার ফলেই এই বিপর্যয়।

মার্কিন কৃত্রিম উপগ্রহ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করেই এ কথা জানিয়েছেন তাঁরা।

ঠিক কী কারণে হিমবাহটি ধসে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে নেপালের সরকারি কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে আঘাত হানা একটি ভূমিকম্প এর পেছনে দায়ী থাকতে পারে।

সীমান্তের দুই পারের কর্তৃপক্ষেরই আশঙ্কা, প্রাণহানির সংখ্যা বর্তমান অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপালে ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।

সীমান্তের দুই পাশের কর্তৃপক্ষই আশঙ্কা করছে, প্রাণহানির সংখ্যা এখনকার হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপালে ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, এখনো নিখোঁজ ৩০০ জনের বেশি পর্যটক। অন্যদিকে চীন সীমান্তে ৩ জনের মৃত্যু আর ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে।

প্ল্যানেট ল্যাবসের পাঠানো দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবিগুলো খতিয়ে দেখেছে রয়টার্স। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ওই অঞ্চলের চিরসবুজ পাহাড়গুলো এখন বাদামি রঙের ধ্বংসস্তূপ আর পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।

বিক্রম গুপ্ত পড়ান ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিষয় প্রকৌশল ভূতত্ত্ব। এই অধ্যাপকের বক্তব্য, ‘এটি নিশ্চিত যে হিমবাহের অগ্রভাগের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার মাধ্যমেই ঘটনার সূত্রপাত হয়। এর সঙ্গে সম্ভবত বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিমাটিও নিচে নেমে এসেছে।’

ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার পড়ান কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারিতে, সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট ছবিতে যা ধরা পড়েছে তাতে মনে হয়, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় প্রচুর বরফ গলেছিল।

এ উপত্যকার কিছু হিমবাহ গতকালও (গত মঙ্গলবার) বরফে ঢাকা ছিল। অথচ আজ সেগুলোর ওপর শুধু উন্মুক্ত বরফস্তর দেখা যাচ্ছে।
— ড্যান শুগার, ভূবিজ্ঞানী, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারি

শুগারের ভাষায়, ‘এ উপত্যকার কিছু হিমবাহ গতকালও (গত মঙ্গলবার) বরফে ঢাকা ছিল। অথচ আজ সেগুলোর ওপর শুধু উন্মুক্ত বরফস্তর দেখা যাচ্ছে। এর সহজ অর্থ হলো, যদিও আমি এখনো আবহাওয়াকেন্দ্রের কোনো তথ্য পাইনি, সেখানকার আবহাওয়া সম্ভবত উষ্ণ ছিল।’

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে নেপালের বরফাবৃত পর্বতগুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে বলে ২০২৩ সালে জানিয়েছিল জাতিসংঘ।

সংস্থাটির ওই বছরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দুই বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশ ভারত ও চীনের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো গত এক দশকে গলেছে আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুতগতিতে।

শুগার আরও বলেন, ‘আজ সকালে (গতকাল বুধবার) প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্রে আমি যা দেখেছি, তা হলো প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে তারও প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়েছে।’

এই বিপর্যয়ের পেছনে ওই অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণকাজও বড় কারণ হতে পারে বলে মনে করেন এই ভূবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন এখানে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি না, তা আমরা নিশ্চিতভাবেই অদূর ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখব।’

‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধস

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের পাহাড়ি জেলা রসুয়ার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এই এলাকায় রয়েছে কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।

দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্ত ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) উত্তর-পূর্বে একটি ভূমিধসের কারণেই লেন্দে নদীতে এই ‘হিমবাহ-মিশ্রিত বন্যা’ দেখা দেয়।

প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে ইঙ্গিত ছিল, ভূকম্পনের কারণে তুষারধস এবং তার জেরেই বন্যা হয়ে থাকতে পারে। তবে ওই সংস্থার ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেল জানান, ভূমিকম্পই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

প্ল্যানেট ল্যাবসের ছবিগুলো পর্যালোচনা করে পোখরেল বলেন, ‘নেপাল অংশে একটি বরফ ও পাথরের ধসের কারণেই এ আকস্মিক বন্যা হয়েছে।’

হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলজুড়ে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস আর খরার তীব্রতা ও প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ জানিয়েছে, এই অঞ্চলে পানি, ভূমি ও বায়ুমণ্ডলের দ্রুত পরিবর্তন মানুষের জীবনযাত্রার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্থাটি গতকাল জানায়, এই আকস্মিক বন্যায় ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা দিয়ে তীব্র বেগে বয়ে গেছে পানি, পলি আর বিশালাকার পাথর। ফলে ভাটির দিকে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই নদীর পানির স্তর বেড়ে যায় প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট।

২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর এই বন্যা ও ভূমিধসকেই নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হচ্ছে।

দুর্যোগের কারণ জানাতে গিয়ে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল গতকাল দেশটির পার্লামেন্টে বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্প হয়। এর তিন মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে শুরু হয় আকস্মিক বন্যা। তবে তিনি যোগ করেন, ‘এটা আমাদের যাচাই করে দেখতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে প্রায়ই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধস হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রকোপ ও ভয়াবহতা দুটোই বাড়ছে।

নেপাল-চীন সীমান্ত নদীর উজানে এখনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে রয়েছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিতে পারে।

এদিকে অল্প সময়ের মধ্যেই আরেক দফা বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং।

এএফপিকে তিনি জানান, সীমান্ত নদীটির উজানের দিকে বাধা এখনো রয়ে গেছে। ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় দফা বন্যা দেখা দিতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে।

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩

নেপালে বন্যা-ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ ৪০৩