আন্তর্জাতিক
নেপালের বন্যার পানি কি সরাসরি বাংলাদেশে আসবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৮ আগস্ট ২০২৬, ৫:২৫ ভোর
হিমালয়ের বরফ, পাথর ও পলির ভয়ংকর পতনটি ঘটেছে গত ২৬ আগস্ট। নেপালের রাসুয়া জেলায় জন্ম নেওয়া সেই আকস্মিক বন্যার অভিঘাত পাহাড়ের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তিব্বত পর্যন্ত। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদী বদলে গেছে ধ্বংসের স্রোতে—ভেসে গেছে সেতু, রাস্তা, বসতি আর জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় নেমে আসা পানি, পলি আর বিশাল বোল্ডারের স্রোত এলাকায় তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকি।
শুরুতে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প-সৃষ্ট দুর্যোগ ভাবা হলেও পরের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে চিত্রটা পাল্টে গেছে। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ হিমালয়ের বরফ ও শিলার বড় ধস নদী-ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ পদার্থ ঢুকিয়ে দিয়ে যে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরি করেছে, সেটিই এখন দুর্যোগের প্রধান ব্যাখ্যা। তবে ঘটনার প্রতিটি পর্যায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চলছে এখনো।
এই বিপর্যয় কেবল নেপালের একটি মানবিক ট্র্যাজেডি নয়; হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও। কারণ পাহাড়ে শুরু হওয়া একটি কম্পাউন্ড বা ক্যাসকেডিং ডিজাস্টার নদীর স্রোত ধরে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বহু দূরের জনপদেও। বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের জন্য তাই নেপালের এই ঘটনা দূরের কোনো দুর্যোগ নয়; বরং নদী, জলবায়ু, পাহাড় ও আঞ্চলিক দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ।
বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে গভীর শোক ও সংহতি জানিয়েছে। গত ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ফোনে কথা বলেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিষির খানালের সঙ্গে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজন হলে ঢাকা নেপালকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে জানতে চাওয়া হয়, নেপালে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত হয়েছেন কি না।
আন্তর্জাতিক পরিসরেও দ্রুত সহায়তার উদ্যোগ দেখা গেছে। ভারত, জাতিসংঘসহ নানা দেশ ও সংস্থা উদ্ধার ও মানবিক সহায়তার প্রস্তুতি নিয়েছে। ফলে এই দুর্যোগ এরই মধ্যে রূপ নিয়েছে একটি আঞ্চলিক মানবিক সংকটে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো—দুর্যোগ যখন সীমান্ত মানে না, তখন উদ্ধার, তথ্য ও সতর্কতাও সীমান্তে আটকে থাকতে পারে না।
যেভাবে ঘটল
২৬ আগস্ট সকালে রাসুয়া জেলার উচ্চভূমি থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ে নিচের নদী-ব্যবস্থায়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ বলছে, লেহন্দে খোলা নদীর একটি উপনদী এলাকায় ঘটে উচ্চভূমির বরফ-পাথরের ধস। সেই বিপুল ধ্বংসাবশেষ নদীতে ঢুকে আকস্মিক প্রবাহ তৈরি করে, পরে যা ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ধরে ছুটে যায় নিম্নস্রোতের দিকে।
তিব্বতের জিরং এলাকাতেও পড়েছে এর অভিঘাত—ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও অন্যান্য স্থাপনা। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার ঝুঁকি সামলাতে চীনা কর্তৃপক্ষ পর্যবেক্ষণে রেখেছে একটি ড্যাম্ড লেক বা প্রাকৃতিকভাবে আটকে থাকা জলাধারও। অর্থাৎ এটি নিছক একটি বন্যা নয়। বরফ-পাথরের ধস, নদীতে বিপুল ধ্বংসাবশেষ, আকস্মিক প্রবাহ—নদী অববাহিকায় ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ডের এক ভয়াবহ উদাহরণ এটি।
হতাহতের হিসাব এখনো স্থির নয়
দুর্যোগের ক্যাজুয়ালটি ফিগার এখনো স্থির হয়নি। ২৭ আগস্টের বিভিন্ন সময়ের সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাবের মধ্যেও রয়েছে পার্থক্য। নেপালের কাঠমুন্ডু পোস্ট দুপুরের সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৭০-এ, আর যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না ৮২৬ জনের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে ৬৪৪ জনই পর্যটক—৫১৭ জন বিদেশি ও ১২৭ জন নেপালি।
অন্যদিকে একই দিনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা দেখানো হয়েছে আরও বেশি। উদ্ধার অভিযান চলমান আর যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন সময়ের হিসাব মিলছে না বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
তাই এই মুহূর্তে কোনো একটি চূড়ান্ত সংখ্যা দিয়ে বিপর্যয়ের পরিসর মাপা ঝুঁকিপূর্ণ। বরং বলা যায়, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে শত শত মানুষ নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ কিংবা যোগাযোগের বাইরে; উদ্ধার ও শনাক্তকরণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হিসাব বদলাতে পারে। রয়টার্স বলছে, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও আছেন—এসেছে ভারতীয়, মার্কিন, ইউক্রেনীয়, অস্ট্রেলীয়, ব্রিটিশ, মালয়েশীয় ও কানাডীয় নাগরিকদের নিখোঁজ থাকার তথ্য।
ভূমিকম্প, না ধস
প্রশ্নটি এই দুর্যোগের বৈজ্ঞানিক রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রাথমিক পর্যায়ে নেপালে একটি ভূমিকম্পের তথ্য সামনে আসে। ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভের ভূমিকম্প তালিকাতেও ২৬ আগস্ট কোদারি এলাকার উত্তর-পশ্চিমে ৫.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু সেই ভূমিকম্পকেই বন্যার সরাসরি কারণ ধরে নেওয়া এখন আর নিরাপদ নয়।
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে বরফ ও পাথরের ধসের সম্ভাবনা রয়েছে এবং সিসমিক যন্ত্রে ধরা পড়েছে অস্বাভাবিক সংকেতও। তবে সেই সংকেত ও বন্যার মধ্যে সরাসরি কারণ-সম্পর্ক তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বরফ-পাথরের ধসকেই দেখা হচ্ছে প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে।
অর্থাৎ ভূমিকম্পের উপস্থিতি থাকলেও ‘ভূমিকম্পই বন্যা ঘটিয়েছে’—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। এখানেই দুর্যোগটির বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব। পাহাড়ে একটি ধস নিজেই এত বিপুল শক্তি তৈরি করতে পারে যে তার প্রভাব ভূমিকম্পের মতো সিসমিক সংকেত হিসেবেও ধরা পড়ে যায়।
৩০ মিনিটে ৩০ ফুট
এই দুর্যোগের সবচেয়ে ভয়ংকর বৈশিষ্ট্য ছিল এর গতি। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর গালচি এলাকায় পানির উচ্চতা মাত্র ৩০ মিনিটেই বেড়ে যায় প্রায় ৯ মিটার, অর্থাৎ প্রায় ৩০ ফুট। মালেখু এলাকাতেও প্রায় একই সময়ে পানির স্তর বাড়ে প্রায় ৭ মিটার।
এ ধরনের ফ্ল্যাশ ফ্লাডে মানুষকে সতর্ক করার সময় থাকে অত্যন্ত সীমিত। সাধারণ বন্যার মতো কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের পূর্বাভাস এখানে যথেষ্ট না-ও হতে পারে। পাহাড়ের ওপরের একটি ধস কয়েক মিনিটের মধ্যেই নদীকে এমন এক প্রবাহে পরিণত করতে পারে, যার গতি ছাপিয়ে যায় মানুষের প্রচলিত প্রস্তুতিকে।
এ কারণেই হিমালয়ের দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনায় কেবল বৃষ্টির পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়। একসঙ্গে নজর রাখতে হবে বরফ, পাথর, নদী, ভূমিধস, সিসমিক সংকেত এবং নদীর পানির আকস্মিক পরিবর্তনের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
নেপালের ঘটনাটি সরাসরি বাংলাদেশের কোনো নদীতে একই ধরনের বন্যা ঘটাবে—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু এর ভেতরে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। বাংলাদেশের পাহাড়ি নদী—বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কর্ণফুলী ও অন্যান্য অববাহিকা—ভূমিধস, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে থাকে। কোনো পাহাড়ি নদীর গতিপথে বড় ভূমিধস বা ধ্বংসাবশেষ জমে সাময়িকভাবে পানি আটকে গেলে সেখানে তৈরি হতে পারে প্রাকৃতিক বাঁধ। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাড।
তবে নেপালের ঘটনা থেকে সরাসরি বান্দরবান, রাঙ্গামাটি বা চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট জনপদ ধ্বংস হবে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা উচিত নয়। বরং দরকার ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি, সম্ভাব্য ল্যান্ডস্লিড-ড্যাম শনাক্তকরণ আর দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। বাংলাদেশের জন্য আসল প্রশ্ন তাই ‘নেপালের পানি কি সরাসরি বাংলাদেশে আসবে’ নয়—হয়তো আসবে না; বরং প্রশ্নটা হলো, হিমালয় ও পার্বত্য অববাহিকায় দ্রুত সৃষ্ট দুর্যোগের তথ্য আমরা কত দ্রুত জানতে পারব।
নদী সীমান্ত মানে না
হিমালয়ের নদীগুলো সীমান্ত মানে না। একটি নদীর উজানে ঘটে যাওয়া বড় ঘটনা তার নিম্ন অববাহিকায় নানা মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতাই দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত নদী-তথ্য বিনিময়ের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, নেপালসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে নদী-তথ্য ও বন্যা-পূর্বাভাস সহযোগিতার কথা বলে আসছে। আঞ্চলিক ফ্লাড ইনফরমেশন সিস্টেমের লক্ষ্যই তো নদীর তথ্য দ্রুত ভাগাভাগি করে প্রাণহানি কমানো। বাংলাদেশের জন্য তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আধুনিক আঞ্চলিক নদী-দুর্যোগ তথ্য নেটওয়ার্ক, যেখানে উপগ্রহ, নদীর গেজ, আবহাওয়া, হিমবাহ, ভূমিধস ও সিসমিক তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা
এককথায় শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে এই ঘটনার একমাত্র কারণ বলা যাবে না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন এ রকম ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে বরফের স্থিতিশীলতা, পাল্টে যাচ্ছে ফ্রিজ-থ-আইস চক্র, আর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে উচ্চ পর্বতের শিলা ও বরফের সংযোগ। রয়টার্সের মতামত অনুযায়ী, এসব পরিবর্তন পাহাড়ি স্লোপ ইনস্ট্যাবিলিটি এবং আইস-রক অ্যাভালাঞ্চের মতো বিপজ্জনক ঘটনার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
গত কয়েক দশকে নেপালের হিমবাহ ও বরফভান্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে; এই বৃহত্তর প্রবণতার ভেতরেই দেখতে হবে দুর্যোগটিকে। তবে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান কতটা, তা নির্ধারণে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। অতএব সবচেয়ে যথাযথ ভাষাটি হলো—জলবায়ু পরিবর্তন সম্ভাব্য ঝুঁকি-বর্ধক, কিন্তু একক কারণ হিসেবে প্রমাণিত নয়।
পর্যটন ও নিরাপত্তা
রাসুয়া অঞ্চল কেবল পাহাড়ি পর্যটনের জায়গা নয়; তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পথের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে নিখোঁজদের একটি বড় অংশই পর্যটক ও তীর্থযাত্রী।
এই বিপর্যয় দেখিয়ে দিল, পাহাড়ে কেবল আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। ভ্রমণকারীদের অবস্থান শনাক্তের ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ, জরুরি ইভাকুয়েশন রুট এবং স্থানীয় দুর্যোগ সতর্কতা ব্যবস্থার সঙ্গে পর্যটন পরিচালনাকে যুক্ত করা জরুরি। জিপিএস বা ট্র্যাকিং প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রযুক্তিই একমাত্র সমাধান নয়। সবচেয়ে বড় দরকার ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, বাস্তবসম্মত ইভাকুয়েশন পরিকল্পনা আর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পর্যটন সংস্থার সরাসরি সমন্বয়।
আলাদা বাক্সে ভাগ করা যাবে না
নেপালের এই মহাবিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—দুর্যোগকে আলাদা আলাদা বাক্সে ভাগ করে দেখা যাবে না। হিমবাহ গলন, পাথরধস, ভূমিধস, নদী অবরুদ্ধ হওয়া, আকস্মিক বাঁধ ভেঙে যাওয়া, ফ্ল্যাশ ফ্লাড আর ডাউনস্ট্রিম ইনানডেশন—সবই হতে পারে একই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের অংশ।
এ কারণেই বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশের দুর্যোগ-পরিকল্পনাকে কেবল নিজের সীমানার মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। হিমালয়ের উচ্চভূমিতে কী ঘটছে, কোন নদীতে পানি বাড়ছে, কোথায় ভূমিধস হয়েছে, কোথায় তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক বাঁধ—এসব তথ্য যত দ্রুত সম্ভব পৌঁছাতে হবে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন মানে কেবল বাঁধ নির্মাণ বা ত্রাণ মজুত করা নয়। দরকার উচ্চভূমি থেকে ভাটির দেশ পর্যন্ত সমন্বিত আগাম সতর্কবার্তার কাঠামো। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি একই—জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলক কম অবদান রেখেও যেসব দেশ ঝুঁকিতে, তাদের অভিযোজন, ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির অর্থায়ন হওয়া দরকার বাস্তব ও দ্রুত।
হিমালয়কে আমরা প্রায়ই দেখি বরফের রাজ্য হিসেবে। কিন্তু হিমালয় একই সঙ্গে এশিয়ার বিশাল নদী-ব্যবস্থার উৎসভূমিও। সেখানে বরফের একটি পরিবর্তন, একটি পাহাড়ধস কিংবা একটি নদী অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা কখনো কখনো প্রভাব ফেলতে পারে কয়েক শ কিলোমিটার দূরের জনজীবনেও। রাসুয়ার এই বিপর্যয় তাই কেবল নেপালের দুর্ভাগ্যের গল্প নয়; দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি সতর্কসংকেত।
প্রকৃতি আগেভাগেই বিপদের ভাষা লিখে রাখে—বরফে, পাহাড়ে, নদীর স্রোতে আর সিসমিক সংকেতে। আমাদের কাজ সেই ভাষা পড়তে শেখা। হিমালয়ের ক্ষত যদি পাহাড়ে দেখা যায়, তার প্রতিধ্বনি শোনা যায় নদীতে। আর সেই নদীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ।
সূত্র: জাগো নিউজ — https://www.jagonews24.com/agriculture-and-nature/article/1151651
বিষয়:: নেপাল · বন্যা · দুর্যোগ · হিমালয়
https://www.news.rayenda.com/bn/international/3cdgz2