রায়েন্দা নিউজ

news.rayenda.com · ছাপার তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৬

খেলা

ফিফাকে ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী

নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:০০ সকাল

ফিফাকে ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করলেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী
ছবি: জাগো নিউজ

ফিফার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত দুর্নীতিকাণ্ডে এবার ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করেছেন আর্জেন্টিনার দুই ব্যবসায়ী হুগো জিনকিস ও মারিয়ানো জিনকিস; সম্পর্কে তাঁরা বাবা-ছেলে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও কোপা আমেরিকার মতো বড় টুর্নামেন্টের লাভজনক সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব পেতে আন্তর্জাতিক ফুটবল কর্মকর্তাদের কোটি কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার কথা মেনে নিয়েছেন তাঁরা।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর পর আসে এই স্বীকারোক্তি। সমঝোতার ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগে বিচার কার্যক্রম আর এগোবে না। তবে চুক্তির অংশ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা হবে তাঁদের ৫ কোটি মার্কিন ডলার।

দুজনেই আর্জেন্টিনার ক্রীড়া বিপণন প্রতিষ্ঠান ফুল প্লে-এর সহ-মালিক। ২০১৫ সালে ফিফাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ব্যাপক দুর্নীতি তদন্তেই তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। সেই তদন্তে ফিফার পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধেও উঠে আসে দুর্নীতির অভিযোগ।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, জিনকিসরা এমন একটি পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন ও বাস্তবায়ন করেছিলেন, যার মাধ্যমে প্রতারিত হয় ফিফা, কনকাকাফ ও কনমেবল।

নথিতে বলা হয়েছে, ফুটবল কর্মকর্তাদের ‘কয়েক কোটি ডলার বাণিজ্যিক ঘুষ’ দিয়েছিলেন তাঁরা। উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতার লাভজনক সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ওই কর্মকর্তাদের সমর্থন আদায় করা।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নেতৃত্বে ফিফার দুর্নীতি নিয়ে যে তদন্ত শুরু হয়, তা নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলকে। তদন্তে ফিফা ও বিভিন্ন মহাদেশীয় সংস্থার একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠে ঘুষ, অর্থপাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। সেই বিশাল তদন্তের জেরেই ফিফাসহ কনকাকাফ ও কনমেবল পড়ে গভীর সংকটে।

তদন্তের অংশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়; একের পর এক গ্রেপ্তার হন কর্মকর্তারা। পরে বিভিন্ন মামলায় অনেকেই দোষ স্বীকার করেন কিংবা বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন।

জিনকিস বাবা-ছেলের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়েছিল, মামলাটি এগোচ্ছিল বিচারের দিকেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রসিকিউটরদের সঙ্গে পৌঁছান ডিফার্ড প্রসিকিউশন অ্যাগ্রিমেন্ট (ডিপিএ) বা স্থগিত বিচার-সমঝোতায়।

এই চুক্তির আওতায় তাঁদের বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগ প্রত্যাহার করবে যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে তাঁরা অপরাধ স্বীকার করেছেন এবং ৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করতে সম্মত হয়েছেন। এই সমঝোতার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লাতিন আমেরিকার ফুটবলের সঙ্গে ফুল প্লের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচের সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব নিয়েই কাজ করত প্রতিষ্ঠানটি।

ফুটবলের জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, টেলিভিশন সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক স্বত্বের মূল্যও বাড়ছে সেই হারে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব কিংবা কোপা আমেরিকার মতো প্রতিযোগিতার স্বত্ব থেকে আয় করা সম্ভব বিপুল অর্থ। এই বিশাল বাণিজ্যিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই জিনকিসরা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছিলেন বলে উঠে আসে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে।

২০১৫ সালের ফিফা দুর্নীতিকাণ্ড ছিল বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম বড় প্রশাসনিক সংকট। দুর্নীতি, ঘুষ ও বাণিজ্যিক স্বত্ব বণ্টন ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্নের মুখে পড়ে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্ব।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক অধিকার ঘিরে চলছিল ঘুষের লেনদেন। এর জেরে গ্রেপ্তার হন ফিফার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা; পরে তাঁদের অনেকেই অপরাধ স্বীকার করেন বা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। জিনকিসদের স্বীকারোক্তি সেই দীর্ঘ তদন্তেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।

এই মামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ঘুষের উদ্দেশ্য মাঠের ফলাফল প্রভাবিত করা ছিল না; লক্ষ্য ছিল মিডিয়া ও বিপণন স্বত্ব। বড় টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার অধিকার এখন শত শত কোটি ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসার অংশ; সেই বাজারে একটি ম্যাচ বা প্রতিযোগিতার স্বত্ব পাওয়াই এনে দিতে পারে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতেই ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছিলেন জিনকিসরা; নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় অন্যদের চেয়ে অবৈধ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাঁরা।

২০১৫ সালের সেই কেলেঙ্কারির এক দশক পর হুগো ও মারিয়ানো জিনকিসের স্বীকারোক্তি দেখিয়ে দিল, দুর্নীতিকাণ্ডটির আইনি অধ্যায় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।

একদিকে বাবা-ছেলে ঘুষ দেওয়ার কথা মেনে নিয়েছেন, অন্যদিকে সম্মত হয়েছেন ৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্তে; বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগে আর বিচার হবে না তাঁদের।

ফুটবলের মাঠে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার লড়াই যতটা রোমাঞ্চকর, মাঠের বাইরে সেসব টুর্নামেন্টের মিডিয়া ও বিপণন স্বত্ব ঘিরে অর্থের লড়াই যে কতটা বড় আর অন্ধকার হতে পারে — জিনকিসদের এই স্বীকারোক্তি তারই আরেকটি উদাহরণ।

সূত্র: জাগো নিউজ — https://www.jagonews24.com/sports/football/1151674

বিষয়:: ফিফা · দুর্নীতি · আর্জেন্টিনা

https://www.news.rayenda.com/bn/sports/7fymm5

আগের