রায়েন্দা নিউজ

news.rayenda.com · ছাপার তারিখ: ৩১ আগস্ট ২০২৬

জাতীয়

বাবাদের উপহারের বিলাসবহুল গাড়ি কক্সবাজারে এনে বেকায়দায় ছেলেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৮ আগস্ট ২০২৬, ৭:৫৩ সকাল

বাবাদের উপহারের বিলাসবহুল গাড়ি কক্সবাজারে এনে বেকায়দায় ছেলেরা
ছবি: জাগো নিউজ

কক্সবাজারের একটি পাঁচতারকা হোটেলের পার্কিং থেকে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। বৈধ আমদানি ও কেনাকাটার কাগজপত্র দেখাতে না পারায় গাড়িগুলো আটক করা হয়।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে গাড়ি তিনটি জব্দ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক রেজভী আহম্মেদ।

ওশান প্যারাডাইসের একটি হলরুমে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি জানান, ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণা দিয়ে গাড়ির নানা যন্ত্রাংশ আমদানি করা হচ্ছিল। পরে সেগুলো জোড়া লাগিয়ে বানানো হচ্ছিল পূর্ণাঙ্গ গাড়ি। অনুসন্ধানে শুল্ক ফাঁকির এই কৌশলটিই ধরা পড়ে, আর সেই সূত্র ধরেই কক্সবাজারে তিনটি গাড়ির সন্ধান মেলে। জব্দ করা গাড়িগুলো জাপানি ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল মডেল বলে জানা গেছে।

রেজভী আহম্মেদ আরও জানান, অভিনব কায়দায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে যন্ত্রাংশ এনে সেগুলোকে পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে রূপ দেওয়া হচ্ছে। বিএমডব্লিউ, টয়োটা রয়াল সালুন, ক্রাউন কিংবা রেঞ্জ রোভারের মতো বিলাসবহুল গাড়িও এভাবে বানিয়ে সড়কে নামানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মোংলা বন্দরে ‘ইউজড কার পার্টস’ ঘোষণায় আসা কয়েকটি চালান নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য পায় অধিদপ্তর। পরে চালানগুলো পরীক্ষা করে তাঁদের মনে হয়, আমদানি করা যন্ত্রাংশগুলো একসঙ্গে জুড়লে অল্প সময়েই একটি আস্ত গাড়ি বানিয়ে ফেলা সম্ভব।

শুল্ক গোয়েন্দার এই কর্মকর্তার ব্যাখ্যা, আন্তর্জাতিক কাস্টমস বিধি অনুযায়ী পণ্যের ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা মৌলিক বৈশিষ্ট্য দেখেই শুল্ক ঠিক করা হয়। কোনো পণ্যের প্রায় সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ একসঙ্গে এনে সংযোজনের মাধ্যমে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ পণ্যে পরিণত করার সুযোগ থাকলে সেটি চূড়ান্ত পণ্য হিসেবেই গণ্য হতে পারে। এই দিকটিকেই সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে তাঁদের চোখ এড়িয়ে কারবারটি চলছিল বলে জানান তিনি।

ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় তথ্যদাতা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়েছে বলেও জানান রেজভী আহম্মেদ।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের একটি আবাসিক এলাকার ভবনের পার্কিং থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ জব্দ করা হয়। গাড়িটির বৈধ আমদানি কিংবা কেনার কোনো নথি এর ব্যবহারকারী দেখাতে পারেননি, ফলে সেটি জব্দ করা হয়। ওই অভিযানের পরই খবর আসে, একই ধরনের তিনটি গাড়ি গেছে কক্সবাজারে। সেই সূত্র ধরে খোঁজ করতে গিয়ে ওশান প্যারাডাইস হোটেলের পার্কিংয়ে গাড়িগুলোর দেখা মেলে।

রেজভী আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা ওশান প্যারাডাইস হোটেলে গিয়ে পার্কিংয়ে গাড়িগুলোর অবস্থান নিশ্চিত হই। দুটি গাড়িতে নম্বর প্লেট ছিল না। গোয়েন্দা টিম হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানায়, এ গাড়ি তিনটি শুল্কফাঁকির গাড়ি। এগুলো কারা এনেছে তাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় গোয়েন্দা টিম গাড়ির মালিক দাবিদারদের সঙ্গে কথা বলে। তাদের গাড়িগুলোর যথাযথ কাগজ দেখাতে অনুরোধ করা হয়।’

কিন্তু গাড়ির সঙ্গে থাকা তরুণেরা দাবি করেন, গাড়িগুলোর ‘রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াধীন’। অথচ ‘অ্যাপ্লাইড ফর রেজিস্ট্রেশন’ লেখা কিংবা এ-সংক্রান্ত দরকারি কাগজপত্রের কিছুই তাঁরা দেখাতে পারেননি। পরদিন সকালে আবার কাগজপত্র চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা সময় নিতে থাকেন। বিকেল পর্যন্ত চলে নানা টালবাহানা। শেষে আইন অনুযায়ী ডিটেনশন মেমো ইস্যু করে গাড়িগুলো জব্দ করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে গাড়ির সঙ্গে থাকা তরুণেরা শুল্ক গোয়েন্দাদের বলেছেন, গাড়িগুলো তাঁরা বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন। তবে এই দাবি কতটা সত্যি, তা নথিপত্র যাচাই করেই দেখা হবে বলে জানিয়েছেন রেজভী আহম্মেদ।

তিনি বলেন, গাড়িগুলোর সঙ্গে থাকা তিনজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকা মেট্রো গ-৩৪ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ হাসিবুর রহমান সিনহা, ঢাকা মেট্রো গ-৩৮ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সাফিয়াত মাহমুদ এবং ঢাকা মেট্রো গ-০৩ নম্বর গাড়িটির বহনকারী মোহাম্মদ সারাফাত রহমান ঈশান। তাঁদের জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্টের তথ্যের পাশাপাশি হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে জব্দ গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিক কে, সে বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে রাজি হননি এই কর্মকর্তা।

গাড়িগুলোর আনুমানিক দাম কত—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রেজভী আহম্মেদ বলেন, দাম নির্ধারণে তাঁরা বিশেষজ্ঞ নন। তবে বিএমডব্লিউ মডেলের গাড়ির দাম ৮০ লাখ টাকা থেকে সাত কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আবার চার হাজার সিসির ওপরে হলে শুল্কের স্ল্যাবও বদলে যায়।

জাপানি গাড়ির দাম ঠিক করা হয় ‘ইয়েলো বুক’ ধরে—এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, জব্দ গাড়িগুলোকে প্রাথমিকভাবে ‘স্পোর্টস কার ও বিলাসবহুল গাড়ি’ বলেই মনে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের লক্ষ্য গাড়িগুলো কীভাবে দেশে এসেছে এবং কোথায় সংযোজন করা হয়েছে, তা বের করা। গাড়িগুলোর আমদানি প্রক্রিয়া কী ছিল, কোথায় অ্যাসেম্বল করা হয়েছে—এসব আমরা তদন্ত করে দেখব। আমদানি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর চোরাচালানের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সব আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনের নেটওয়ার্কও খুঁজে বের করা হবে।’

আমদানি অবৈধ প্রমাণিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিংয়ের প্রসঙ্গও তদন্তে আসতে পারে বলে জানান তিনি। আর গাড়ির ব্র্যান্ড নকলের প্রমাণ পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখা হবে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের বিষয়টিও।

গাড়িগুলোর মালিকেরা রাজনৈতিক নেতা কিংবা কোনো আমলা কি না—এমন প্রশ্নে তাঁর জবাব, পেশা বা রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত করা শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তের বিষয় নয়।

জব্দ অভিযানে র‍্যাব-১৫, কক্সবাজার জেলা পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সহযোগিতা করেছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়। পুরো প্রক্রিয়ার সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বিষয়টি সরাসরি তদারক করছেন, আর শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালকের মাধ্যমে তাঁরা নিয়মিত নির্দেশনা পাচ্ছেন।

জব্দ গাড়িগুলো শুল্ক গোয়েন্দার হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত শেষ হলেই ঠিক হবে গাড়িগুলোর ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাগজপত্রের সঠিকতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি হবে। তবে চোরাচালানের লক্ষণ স্পষ্ট হলে প্রযোজ্য সব আইন প্রয়োগ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় কোনো বিদেশি নাগরিক জড়িত কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই বলে জানান রেজভী। তদন্তে তেমন কারও নাম উঠে এলে তাঁকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো মামলা হবে না বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির উপ-পরিচালক প্রণয় চাকমা।

এদিকে প্রেস ব্রিফিংয়ের বার্তা পেয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা ওশান প্যারাডাইসে গেলে গাড়ির সঙ্গে থাকা তরুণেরা তাঁদের সঙ্গে ‘অশালীন’ আচরণ করেন। একপর্যায়ে তাঁরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন, এতে সাংবাদিকেরাও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষ ও উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি সামাল দেন।

সূত্র: জাগো নিউজ — https://www.jagonews24.com/country/news/1151684

বিষয়:: কক্সবাজার · শুল্ক ফাঁকি · গাড়ি

https://www.news.rayenda.com/bn/national/8aaybg

আগের