জাতীয়
‘বাঁচতে চাইলে সব দে’, ঢাকায় ঢুকেই যাত্রাবাড়ীতে তাঁরা অপরাধের শিকার
নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৬ আগস্ট ২০২৬, ৩:২৬ রাত
তখন ভোর। রাঙামাটি থেকে বাসে ঢাকায় পৌঁছে যাত্রাবাড়ীতে নামেন চিকিৎসক শামসুন্নাহার হেনা। গন্তব্য চাঁদপুর। ভোরের লঞ্চ ধরতে রিকশা নিয়ে যাত্রাবাড়ী থেকে সদরঘাটের পথে রওনা দেন তিনি।
এরপর কী ঘটল, সেটা শামসুন্নাহারের মুখেই শোনা যাক। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি জানান, যাত্রাবাড়ী মোড়ের কাছে তিনজন ছিনতাইকারী রিকশাটি থামায়। একজন রিকশাচালকের গলায় চাকু ধরে, আরেকজন ধরে তাঁর নিজের গলায়। তৃতীয়জন সামনে দাঁড়িয়ে জানতে চায়, ব্যাগে কী কী আছে।
শামসুন্নাহার বলেন, ‘তারা আমার গলায় চাকু ধরে বলে, “জান বাঁচাইতে চাস, নাকি মাল চাস? বাঁচতে চাইলে সব দে।” তখন আমি ভয়ে ভয়ে বলি, জান চাই। তারপর ওরা ফোন, লাগেজ—সবকিছু নিয়ে যায়।’
ঘটনাটি গত ৩ ফেব্রুয়ারির। পরদিনই যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেন তিনি। শামসুন্নাহার জানান, র্যাবে চাকরি করেন তাঁর এক আত্মীয়; তাঁর সহায়তাতেই মুঠোফোনটি উদ্ধার করা গেছে। তবে বাকি কিছুই আর ফেরত পাননি।
মারধর খেয়েও ভয় পায়নি ছিনতাইকারী
ফরিদপুর থেকে গাড়িতে যাত্রী নিয়ে গত ১২ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাচ্ছিলেন রাজু শেখ। গাড়িটি যখন যাত্রাবাড়ীর মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে উঠছিল, তখন খানিকটা যানজটে পড়ে। উড়ালসড়কে তাঁদের সামনের একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এক ব্যক্তি। সেটি চোখে পড়ায় ওই গাড়ির চালক ও যাত্রীরা নেমে তাঁকে কয়েকটি কিলঘুষি দিয়ে ছেড়ে দেন।
ঘটনা কিন্তু সেখানেই থামেনি। চালক ও যাত্রীরা গাড়িতে ওঠামাত্র ওই ব্যক্তি তাঁদের পিছু নেন। এর কিছু অংশ ভিডিও করে পরে ফেসবুকে দেন রাজু শেখ।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিল যে ছিনতাইকারীকে ধরে মারধর করার পরও সে ভয় পাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আশপাশে তার সাথে আরও কয়েকজন যুক্ত রয়েছে। নইলে এত সাহস নিয়ে এমন কাজ করার কথা নয়।’ তাঁর ভাষ্য, ‘নিয়মিত এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি, এমন ঘটনা প্রায়ই দেখি।’
যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও দোলাইরপাড় এলাকায় ৯, ১৬, ১৭ ও ১৮ আগস্ট—এই চার দিন ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাত্রাবাড়ী এলাকায় ছিনতাইকারীরা ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই ছিনতাই করে।
যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ আর দোলাইরপাড় এলাকায় ৯, ১৬, ১৭ ও ১৮ আগস্ট—এই চার দিন ঘুরে এবং মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ছিনতাইকারীরা এলাকাজুড়ে ঘুরে বেড়ায়, সুযোগ পেলেই হাত সাফ করে। পুলিশের দাবি, তারা নিয়মিতই ছিনতাইকারীদের ধরছে। তবু ছিনতাই থামে না—জামিনে ছাড়া পেয়ে তারা আবার নেমে পড়ে পুরোনো কাজেই।
ঢাকার প্রবেশমুখেই বিশৃঙ্খলা
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কের সংযোগস্থল যাত্রাবাড়ী। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালুর পর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল অর্থাৎ খুলনা ও বরিশাল বিভাগের মানুষের সড়কপথে যাতায়াতের মূল পথ এখন ঢাকা-ভাঙ্গা মহাসড়ক, যার শুরুটা এই যাত্রাবাড়ী থেকেই। কাছেই সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল। বাসমালিকেরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর সায়েদাবাদে যাত্রীর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ।
দেশের চার বিভাগের মানুষকে ঢাকায় ঢুকতে-বেরোতে হয় এই যাত্রাবাড়ী দিয়েই। অথচ রাজধানীর এই প্রবেশমুখটাই অনিরাপদ, বিশৃঙ্খল। এখানে সাধারণ মানুষ কেবল সম্পদ নয়, প্রাণও হারাচ্ছেন। যাত্রাবাড়ী থানা সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত জুলাই পর্যন্ত এলাকাটিতে ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত তিনজন। এই সময়ে থানায় ছিনতাই ও ছিনতাইচেষ্টার মামলা হয়েছে ১১৯টি।
একই সময়ে ছিনতাই, ছিনতাইচেষ্টা ও ডাকাতিচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ১৫১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ। এর মধ্যে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন—এমন আসামিও আছেন।
মামলার পরিসংখ্যান দিয়ে অবশ্য অপরাধের প্রকৃত চিত্র মেলে না। কারণ ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না।
যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজুর দাবি, ছিনতাইকারীদের কেউ প্রশ্রয় দেয় না; তারা ভাসমান, বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ছিনতাই করে চলে যায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ছিনতাই কমাতে অভিযান পরিচালনা করি। আগের থেকে অপরাধ অনেকটাই কমে এসেছে। ছিনতাইকারীদের ধরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হয়।’
গবেষণায় উঠে এসেছে যেসব ঝুঁকির জায়গা
অপরাধের খবরে যাত্রাবাড়ীর নাম এত বেশি আসছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা এলাকাটি নিয়ে রীতিমতো গবেষণাই করেছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ডেমরা থানার অপরাধ মানচিত্র ও বিশ্লেষণ’ শীর্ষক ওই গবেষণা বলছে, সবচেয়ে বেশি অপরাধ ঘটে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়ক অংশ, দোলাইরপাড় ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে। ব্যস্ত সড়ক, মানুষের ভিড় আর দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় জায়গাগুলো অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ভোর আর সন্ধ্যায়।
সায়েদাবাদ থেকে ছাড়ার সময় নামী বাস কোম্পানিগুলোর কর্মীরা যাত্রীদের ছিনতাই নিয়ে সতর্ক করে দেন। তারপরও অনেকে শিকার হন। যেমন বান্দরবানে যাওয়ার জন্য ১২ আগস্ট সায়েদাবাদ থেকে বাসে ওঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী এস আল আমিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাসটি রাত ১০টার দিকে সায়েদাবাদ থেকে যাত্রাবাড়ীর দিকে যায়। তার আগেই সুপারভাইজার সতর্ক করে দিয়েছিলেন—জানালা দিয়ে মুঠোফোন ও গয়না ছিনতাইয়ের চেষ্টা হতে পারে, তাই জানালা বন্ধ রাখতে হবে।
আল আমিন বলেন, ‘আমরা জানালা বন্ধ রেখেছিলাম। যাত্রাবাড়ীতে ৭ থেকে ৮ বার বাইরে থেকে আমাদের বাসের জানালা খোলার চেষ্টা করে এক ব্যক্তি। কিন্তু খুলতে পারেনি। আমরা দেখলাম, ওই ব্যক্তিই সামনের বাসের জানালা দিয়ে একজনের মুঠোফোন ছোঁ মেরে নিয়ে দৌড় দিচ্ছে। আশপাশে পুলিশ থাকার পরও এমন ঘটনা ঘটল।’
যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়েও কয়েকটি কোম্পানির দূরপাল্লার বাস থামে। এসব বাসের যাত্রীদের মুঠোফোন ও গয়না ছিনিয়ে নিতে ছিনতাইকারীরা ঘুর ঘুর করে।
যাত্রাবাড়ীর জনপদ মোড়েও থামে কয়েকটি কোম্পানির দূরপাল্লার বাস। সেসব বাসের যাত্রীদের মুঠোফোন আর গয়নার লোভে ছিনতাইকারীরা ঘোরাফেরা করে আশপাশেই। ১৬ আগস্ট দুপুরে জনপদ মোড়ে এক ব্যক্তিকে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন চায়ের দোকানদার শরীফুল মিয়া, বলছিলেন—আর দেখলে পা ভেঙে দেবেন। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এরা ছিনতাইকারী। দেখছেন না ঘুর ঘুর করছে! চুপ করে বসে থেকে ফোন টান দিয়ে নিয়ে দৌড় দেবে। এরা আমাদের ব্যবসার বদনাম করে।’
প্রাণ গেছে যাঁদের
গত ১৯ মাসে যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের একজন কাওসার হাওলাদার (২৫)। পুলিশ বলছে, গত বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকায় ছিনতাইকারীরাই তাঁকে খুন করে। গত বছরের ১৫ নভেম্বর খুন হন অটোরিকশাচালক মো. ইউসুফ। আর ২০ ডিসেম্বর রাত একটার দিকে যাত্রাবাড়ীর চৌরাস্তা এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান কাপড় ব্যবসায়ী আশীষ জোয়ারদার।
ইউসুফের বাবা মো. খোকন প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ছেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। রাত ১০টার পর থেকে ছেলে আর ফোন ধরেননি। ভোররাত ৪টার দিকে তাঁর মেয়ের ফোনে এক ব্যক্তি ইউসুফের লাশ পাওয়ার খবরটি জানান।
খোকন আরও জানান, পুলিশ এক আসামিকে ধরেছিল, তিনি জামিনে ছাড়া পেয়ে গেছেন। ছেলে হত্যার বিচার তিনি চান, তবে আদৌ বিচার পাবেন কি না—সেই সংশয়ও রয়ে গেছে তাঁর মনে।
এদিকে গত সোমবার ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়ে মৃত্যু হয়েছে এক যুবকের। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনার পর সেখানেই তিনি মারা যান। তাঁর নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
ওই যুবককে হাসপাতালে নিয়ে আসা অটোরিকশাচালক ইসরাফিল সাংবাদিকদের বলেন, যাত্রাবাড়ী বাসস্টেশন এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন ওই যুবক। পরে ওই নারী তাঁকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে চলে যান। এরপরই সেখানে উপস্থিত লোকজন তাঁকে পিটুনি দেন।
বাসভর্তি যাত্রীও রেহাই পান না
কুড়িগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী পিংকি পরিবহনের একটি বাস গত ২৫ মে রাতে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে। বাসটির সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক বাদী হয়ে পরদিন মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ৩৬ জন যাত্রী নিয়ে বাসটি নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসছিল। রাত দুইটার দিকে শনির আখড়া পেরোনোর পরপরই ডাকাতের কবলে পড়ে সেটি। ডাকাতেরা বাসে উঠে ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখায় এবং যাত্রীদের কাছ থেকে মুঠোফোন, টাকা ও গয়না কেড়ে নেয়।
সুপারভাইজার মোজাম্মেল হক ১৭ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, এই রাস্তা ভীষণ ভয়ংকর। কিন্তু উপায় নেই—বাস নিয়ে রাস্তায় নামতেই হয়, আর ঢাকায় ঢুকতে হলে যাত্রাবাড়ী পেরোতেই হয়।
সূত্র: প্রথম আলো — https://www.prothomalo.com/bangladesh/crime/0h7e0a61eu
বিষয়:: ঢাকা · ছিনতাই · যাত্রাবাড়ী · অপরাধ
https://www.news.rayenda.com/bn/national/dges59