ধর্ম
চাচার সঙ্গে শামে: কিশোর নবীর প্রথম দূরযাত্রা
নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৬ আগস্ট ২০২৬, ৭:০০ সকাল
প্রাচীন আরবের অর্থনীতির ভিত ছিল দূরপাল্লার বাণিজ্য কাফেলা। রুক্ষ ভূগোলের কারণে কৃষিতে পিছিয়ে থাকা কোরাইশদের জীবিকা নির্ভর করত প্রায় পুরোপুরি এই কাফেলা-বাণিজ্যের ওপরই। কোরআনেও এই ঐতিহ্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফর’ নামে। (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ২)
কৈশোরের শুরুতে চাচা আবু তালিবের সঙ্গী হয়ে এমনই এক শাম সফরেই ঘটে মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। এই যাত্রার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে সিরাত সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ঘটনা—খ্রিষ্টান সাধু বাহিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ।
ঘটনার মূল কাঠামোটি নিয়ে সিরাতের বিভিন্ন উৎসে তেমন কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ বাধে খুঁটিনাটিতে গিয়ে—পথের দৈর্ঘ্য, নবীজির বয়স কিংবা সফরের তারিখ কতটা নিশ্চিত করে বলা যায়, সেই প্রশ্নগুলো আলাদা করে যাচাই করে নেওয়া দরকার।
কতটা পথ, কত দিনের
সেই সময়ের কাফেলার গন্তব্য ছিল শামের সীমান্ত শহর বুসরা (বুসরা আল-শাম)—আজকের সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে জর্ডান সীমান্তের কাছের এক ঐতিহাসিক নগরী, যা ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এবং প্রাচীনকালে ছিল রোমান আরবিয়া প্রদেশের রাজধানী।
মক্কা থেকে বুসরার দূরত্বের হিসাবে বিভিন্ন উৎসে কিছুটা তারতম্য মেলে। আকাশপথে সরলরেখায় দূরত্ব প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার, আর আধুনিক সড়কপথে তা ১,৫৫০ থেকে ১,৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
প্রাচীন কাফেলা-পথ এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও ছিল ধরে নিলে দূরত্ব দাঁড়ায় প্রায় ১,৩৫০ কিলোমিটার। (ইবনে সাইয়্যিদ আন-নাস, উয়ুনুল আসার ফি ফুনুনিল মাগাজি ওয়াশ শামায়িল ওয়াস সিয়ার, ১/৪৫, দারুল কলম, বৈরুত, ১৯৯৩)
মক্কা থেকে ৩৩ দিনের পথ অতিক্রম করে কাফেলাটি বুসরায় পৌঁছায় এপ্রিলের শেষ ভাগে, যা ছিল শামের গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যের মোক্ষম সময়।
সে যুগে লম্বা সফরের মাপকাঠি ছিল ‘মারহালাহ’, অর্থাৎ এক দিন-রাতে যতটা পথ স্বাভাবিকভাবে পাড়ি দেওয়া যায়। নামাজ কসরের প্রসঙ্গে ফিকহশাস্ত্রে এই একককে সাধারণত ৪১ থেকে ৪৪.৫ কিলোমিটার ধরা হয়। উটের কাফেলার গতি ছিল ঘণ্টায় গড়ে ৪.৫ কিলোমিটার, আর দিনে চলত ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা।
এই হিসাবে মক্কা থেকে বুসরার পথ ছিল মোটামুটি ৩০ থেকে ৩৬ মারহালাহর; অর্থাৎ বিরতিহীন যাত্রায় একমুখী সফরে সময় লাগত প্রায় এক মাস। (আলি জুমআ, আল-মাকায়িল ওয়াল মাওয়াজিন আশ-শারইয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৬৪, দারুল কুদস, কায়রো, ২০০১)
বয়স নিয়ে যে দ্বৈততা
নবীজির বয়স নিয়ে সিরাতের বর্ণনাগুলোতে ভিন্নতা আছে। কিছু বর্ণনায় ৯ বছরের কথা এসেছে, তবে অধিকাংশ বর্ণনায় ১২ বছরের; প্রাচীন ও আধুনিক—উভয় ধরনের সিরাত-গবেষণাতেই এই দ্বৈততা স্বীকৃত। সিরাতকারদের বেশির ভাগই অগ্রাধিকার দেন বারো বছরের বর্ণনাকেই।
ইবনে জাওজি বয়সের একেবারে নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক দিয়েছেন—১২ বছর ২ মাস ১০ দিন। (ইবনে জাওজি, তালকিহু ফুহুমি আহলিল আসার ফি উয়ুনিত তারিখ ওয়াস সিয়ার, পৃষ্ঠা ১৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)
মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব তাঁর মুখতাসারুস সিরাহ গ্রন্থে (পৃ. ১৫, মাকতাবাতুর রিয়াদ আল-হাদিসাহ, রিয়াদ) এবং সফিউর রহমান মুবারকপুরী তাঁর আর-রাহিকুল মাখতুম গ্রন্থে (পৃ. ৫০, দারুস সালাম, রিয়াদ, ১৯৭৯) ইবনে জাওজির সূত্র উল্লেখ করে এই হিসাবই সমর্থন করেছেন।
আগের আলোচনায় দাঁড় করানো জন্মতারিখটি (৯ রবিউল আউয়াল, ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ) ধরে এই অঙ্ক হিজরি-পূর্ব কাঠামোয় বসালে দেখা যায়, বারো বছর পূর্ণ হচ্ছে ৪১ হিজরি পূর্বে। গ্রেগরীয় হিসাবে সেটি এসে দাঁড়ায় ৫৮২ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরের কাছাকাছি, ১১ তারিখ নাগাদ—হিসাবটি মোটের ওপর মিলে যায়।
তবে এর সঙ্গে ২ মাস ১০ দিন যোগ করলে সফর শুরুর সময় দাঁড়ায় ১৯ জমাদিউস সানি ৪১ হিজরি পূর্ব, গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারে যা ৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মার্চ (শুক্রবার)।
যদিও এই দাবিটি পুরোপুরি নিশ্চিত ধরে নেওয়া কঠিন। কারণ ইসলামি মাস গণনায় ‘নাসি’-জনিত অনিশ্চয়তার কারণে এই যোগফল সামান্য ভিন্ন ফলও দিতে পারে। বরং যাত্রার সময়কালকে ‘৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দের বসন্তের কাছাকাছি সময়’ বলাই বেশি যুক্তিসংগত।
কারণ ঐতিহাসিক বর্ণনা বলছে, আরবরা প্রচণ্ড গরম শুরুর আগেই শামের উদ্দেশে রওনা দিত, গোটা গ্রীষ্ম শামের বিভিন্ন বাজারে কেনাবেচা করে ফিরত শরৎকালে। সেই হিসাবে মার্চের মাঝামাঝি মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করাটাই বাস্তবসম্মত, কারণ সেটি ছিল আরবের বসন্তকালের শেষ ভাগ।
মক্কা থেকে ৩৩ দিনের পথ পেরিয়ে কাফেলাটি বুসরায় পৌঁছায় এপ্রিলের শেষ দিকে—শামের গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্যের মোক্ষম সময়েই।
বাহিরার সঙ্গে সাক্ষাৎ
কাফেলাটি যখন শামের সীমান্তসংলগ্ন বসরার উপকণ্ঠে পৌঁছায়, তখনই ঘটে খ্রিষ্টান পাদ্রি বাহিরার সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক মোলাকাত। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮০, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
বাংলা ও উর্দু সিরাতগ্রন্থে এই চরিত্রকে সাধারণত ‘বুহাইরা’ বলা হলেও প্রাচীন আরবি পাণ্ডুলিপি ও পাশ্চাত্য গবেষণা—দুই জায়গাতেই বিশুদ্ধতর রূপটি ‘বাহিরা’।
এটি আসলে কোনো ব্যক্তিনামই নয়; এসেছে প্রাচীন সুরিয়ানি-আরামাইক ভাষার ‘বহিরা’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘পরীক্ষিত’ বা ‘মনোনীত’। (আর্থার জেফরি, দ্য ফরেন ভোকাবুলারি অব দ্য কোরআন, পৃ. ৮১, ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউট, বরোদা, ১৯৩৭; তুলনীয়: এনসাইক্লোপিডিয়া ডটকমের ‘বাহিরা লিজেন্ড’ নিবন্ধ)
ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, এই পাদ্রির আসল নাম ছিল জারজিস কিংবা জর্জ; পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিকদের লেখায় আবার মেলে ‘সের্গিউস’ নামটিও। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮০, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০) আদি যুগের চার প্রধান ঐতিহাসিক—ইবনে সাদ, ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম ও তাবারি—প্রত্যেকেই নিজেদের রচনায় আলাদা করে ঘটনাটি তুলে রেখেছেন।
বাহিরার আস্তানা ছিল বুসরা শহরের বাইরে, এক নির্জন সন্ন্যাসাশ্রমে। তাওরাত আর ইনজিল—দুই শাস্ত্রেই ছিল তাঁর গভীর দখল। কোরাইশদের কাফেলা বছরের পর বছর সেই আশ্রমের পাশ দিয়েই আসা-যাওয়া করত, অথচ তাদের সঙ্গে কোনো দিন বাক্যালাপ করেননি তিনি।
কিন্তু এবার তাঁর চোখে পড়ে, একটি মেঘখণ্ড কেবল এই কাফেলা আর এক কিশোরের মাথার ওপরই ছায়া দিয়ে চলছে। (ইবনে ইসহাক, আস-সিয়ার ওয়াল মাগাজি, পৃ. ৫৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৭৮)
এবার তিনি গোটা কাফেলাকেই মেহমান হিসেবে ডেকে নেন। বয়সে ছোট বলে কিশোর মুহাম্মদ (সা.) তখন মালপত্র পাহারা দিতে তাঁবুতেই রয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আলাদা করে ডেকে পাঠানো হয় তাঁকেও। তাঁর আচরণ দেখে এবং দুই কাঁধের মাঝখানে মোহরে নবুয়ত চোখে পড়ায় আবু তালিবকে সাবধান করে দেন এই পাদ্রি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৬২০)
প্রশ্নটা ছিল সোজাসাপটা—“এই কিশোর আপনার কে হন?” উত্তর এল, “আমার ছেলে।” বাহিরা তাতে সায় দিলেন না, “না, এঁর পিতা জীবিত থাকার কথা নয়।” তখনই আবু তালিব খোলাসা করেন, ছেলেটি আসলে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র, আর তার বাবা মারা গিয়েছিলেন তার জন্মেরও আগে।
বাহিরা তখন সতর্ক করে বলেন, “আপনার ভাতিজাকে নিয়ে অবিলম্বে মক্কায় ফিরে যান এবং রোমান ও ইহুদিদের দৃষ্টি থেকে তাঁকে রক্ষা করুন। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এই লক্ষণগুলো দেখে ফেলে, তবে তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। কারণ এই বালক ভবিষ্যতে এক মহান মর্যাদার অধিকারী হবেন।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/১৮২, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৯০)
এই সতর্কবার্তা শুনে আবু তালিব দ্রুত পণ্য বিক্রি সেরে ভাতিজাকে নিয়ে মক্কার পথ ধরেন।
যাত্রাপথের তিন অভিজ্ঞতা
এই ঐতিহাসিক যাত্রায় কিশোর মুহাম্মদ (সা.) মুখোমুখি হয়েছিলেন তৎকালীন মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার।
১. প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ভেতর দিয়ে যাত্রা: কাফেলাটি মদিনা পেরিয়ে খাইবার ও ওয়াদিউল কুরার পথ ধরে অতিক্রম করে প্রাচীন সামুদ জাতির ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ ‘মাদায়েন সালেহ’ (আল-হিজর)। পরবর্তী কালে এই প্রাচীন অভিশপ্ত এলাকাগুলো দ্রুত এবং আত্মসমালোচনার সঙ্গে পাড়ি দিতে বলেছেন তিনি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৮০; ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ২/২২১, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৯৫)
২. মরূদ্যানে যাত্রাবিরতি: হেজাজ ও উত্তর আরবের রুক্ষ পাহাড়ি উপত্যকা পেরোনোর সময় দীর্ঘ পথ সচল রাখতে পানি ও রসদের জন্য কাফেলাটিকে নিয়মিত থামতে হতো প্রাচীন তায়মা ও তাবুকের মতো প্রধান মরূদ্যানগুলোতে। (শাওকি আবু খালিল, আতলাস আল-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ৪৫-৪৮, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ২০০৪)
৩. রোমান-বাইজেন্টাইন সভ্যতার সংস্পর্শ: তৎকালীন হেজাজের গ্রামীণ মরুময় পরিবেশের তুলনায় বসরা ছিল রোমান সাম্রাজ্যের ‘প্রভিন্সিয়া আরাবিয়া’র প্রাদেশিক রাজধানী।
সেখানে ঢোকার মধ্য দিয়েই কোরাইশ কাফেলা প্রথমবারের মতো দেখে রোমান দুর্গ, বিশাল পাথুরে অ্যাম্ফিথিয়েটার আর সেই সময়ের উন্নত আন্তর্জাতিক নগর কাঠামো। (আকরাম জিয়া আল-উমারি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ আস-সহিহাহ, ১/১০৬–১০৭, মাকতাবাতুল উলুম ওয়াল হিকাম, মদিনা, ১৯৯৪)
সূত্র: প্রথম আলো — https://www.prothomalo.com/religion/islam/b3e6ge2vu0
বিষয়:: ইসলাম · সিরাত · নবীজীবন
https://www.news.rayenda.com/bn/religion/ewpbl9