রায়েন্দা নিউজ

news.rayenda.com · ছাপার তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৬

অর্থনীতি

জ্বালানি আমদানিতে খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থনীতির মন্দাভাবে রিজার্ভে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক · ২৬ আগস্ট ২০২৬, ৭:০০ সকাল

জ্বালানি আমদানিতে খরচ বেড়ে দ্বিগুণ, অর্থনীতির মন্দাভাবে রিজার্ভে স্বস্তি
ছবি: প্রথম আলো

বিশ্ববাজারে জ্বালানির চড়া দামের কারণে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে গুনতে হয়েছে আগের বছরের দ্বিগুণ অর্থ। এই খাতে মোট আমদানি ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। জ্বালানির এই বাড়তি খরচের ধাক্কাতেই দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়েছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি। তথ্যগুলো পাওয়া গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে।

তবে জ্বালানির পেছনে দ্বিগুণের বেশি অর্থ ঢালার পরও দেশের ডলারের বাজার প্রায় সারা বছরই স্থিতিশীল ছিল। এর মূল কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের মন্দাভাবের পাশাপাশি ভোগ্যপণ্য, শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামালের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়নি, ডলারের বাজার শান্ত থেকেছে এবং রিজার্ভও বেড়েছে। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতাই এখন ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতার বড় কারণ।

তাঁদের মতে, অর্থনীতিতে এই ধীরগতি না থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপে ২০২২ সালের মতোই ডলারের দামে অস্থিরতা দেখা দিত, আর তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ত নানা খাতে। কিন্তু ধীরগতি ডলারের বাজারকে স্থিতিশীল রাখলেও পরিস্থিতিটা মোটেই স্বস্তির নয়। কারণ, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানও থমকে গেছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণ খরচের পরও আমরা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছি না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে মন্দাভাব থাকায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পরও ডলার ও রিজার্ভে বড় ধাক্কা লাগেনি। পাশাপাশি বিদেশি ঋণছাড় ও প্রবাসী আয়ে গতি ছিল, এ কারণে খুব বেশি সমস্যা হয়নি। তবে আগামী দিনে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির চাপও বিদ্যমান। তাই ডলার ও রিজার্ভের ওপর যাতে নতুন করে চাপ তৈরি না হয়, সে জন্য এখনই কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে।’

খরচ কতটা বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আমদানি খরচ দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খরচ হয়েছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি খরচ বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার বা ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু অপরিশোধিত জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতেই গেছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার; আগের অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল ৫ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে আগস্ট, অক্টোবর ও নভেম্বর—এই তিন মাসে আমদানি কমলেও বাকি ৯ মাসে খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জ্বালানি আমদানিতে খরচ ছিল ৫২ কোটি ডলার, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয় ৭৩ কোটি ডলার। গত জানুয়ারিতে এই খাতে খরচ হয় ৭০ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০ কোটি ডলার। গত এপ্রিলে খরচ দাঁড়ায় ১৩৪ কোটি ডলারে, আগের বছরের এপ্রিলে যা ছিল ৩৫ কোটি ডলার। আর গত জুনে খরচ হয় ১৬০ কোটি ডলার, আগের বছরের জুনে যা ছিল মাত্র ২৬ কোটি ডলার।

আগের অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণ খরচের পরও আমরা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছি না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে মন্দাভাব থাকায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পরও ডলার ও রিজার্ভে বড় ধাক্কা লাগেনি।
— মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

ডলার ও রিজার্ভ পরিস্থিতি

জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়লেও প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বগতি আর বিদেশি ঋণছাড়ের কারণে রিজার্ভ কিংবা ডলারের দামে সেই বাড়তি খরচের বড় প্রভাব পড়েনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম ৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম হিসাবের বাইরে সাধারণ হিসাবে মোট রিজার্ভের পরিমাণ আরও কিছুটা বেশি—৩৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত বছরের জুন শেষে আন্তব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম ছিল ১২২ টাকা ৭৭ পয়সা। গত জুনে তা সামান্য বেড়ে হয় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। ২০ আগস্ট আন্তব্যাংক দর ছিল ১২২ টাকা ৭ পয়সা। তবে আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের জন্য এক থেকে দেড় টাকা বেশি গুনতে হয়, আর কার্ডের বিল পরিশোধে ব্যাংকগুলো ডলারের দাম ধরে ১২৫ টাকা পর্যন্ত।

গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি মিলেছিল ৮৩২ কোটি ডলারের, আর ঋণছাড় হয়েছে ৮০৭ কোটি ডলার। ঋণছাড়ে সবার ওপরে ছিল বিশ্বব্যাংক—২০৭ কোটি ডলার। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ১৯১ কোটি ডলার ছাড় করে দ্বিতীয়, আর ১০৫ কোটি ডলার দিয়ে তৃতীয় স্থানে রাশিয়া। পাশাপাশি বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি খরচের তুলনায় প্রবাসী আয় ও রপ্তানির বিপরীতে বেশি ডলার দেশে এসেছে। সেই সুযোগে ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় ৬৫০ কোটি ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন অবশ্য ব্যাংক থেকে ডলার কেনা প্রায় বন্ধ। সামনে ইরান যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং শিল্পের মূলধনি যন্ত্র ও কাঁচামালের আমদানি বাড়লে চাপ তৈরি হতে পারে; তখন দায় মেটাতে হবে রিজার্ভ থেকেই।

জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্র, কাঁচামাল ও জ্বালানির কারণে আমদানি খরচ আরও বাড়বে। তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে। আশা করি, প্রবাসী আয় ও রপ্তানির কারণে ডলারের বাজার স্বাভাবিক থাকবে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ না থামলে ডলারের ওপর চাপ আসতে পারে। যুদ্ধ থেমে গেলে চাপ কিছুটা কমবে। তাই আমাদের এখন থেকেই সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে।’

সূত্র: প্রথম আলো — https://www.prothomalo.com/business/economics/b35wxi4n02

বিষয়:: জ্বালানি · রিজার্ভ · ডলার · অর্থনীতি

https://www.news.rayenda.com/bn/economy/yhmli3

আগের