অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়ের কথা মাথায় রেখে বাজারে দুটি নতুন মোটরসাইকেল এনেছে হিরো মোটোকর্প। এই নতুন সেগমেন্ট ধরে নিজেদের অবস্থান আরও পোক্ত করাই তাদের লক্ষ্য। বাংলাদেশে কার্যক্রমের ১২ বছর পূর্তি উদ্যাপনের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ‘এক্সপালস ২০০ ৪ভি’ ও ‘এক্সপালস ২০০ ৪ভি প্রো’ বাজারে আনার ঘোষণা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
এ উপলক্ষে ঢাকায় এসেছিলেন হিরো মোটোকর্পের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হর্ষবর্ধন চিত্লে। বাংলাদেশের বাজার, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন, নতুন পণ্য আর সামনের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াহইয়া নকীব।
বাংলাদেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ
এ দেশের সঙ্গে হিরোর সম্পর্ককে নিছক একটি কৌশলগত বাজারের হিসাবে দেখতে রাজি নন চিত্লে। তাঁর কথায়, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক পরিচয় আর শিল্পভিত্তিরই একটা বড় অংশ। গত ১২ বছরে নিলয় মোটরসকে সঙ্গী করে এখানে উৎপাদন, বিক্রি ও সেবা মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম দাঁড় করানো হয়েছে বলে জানান তিনি। বিভিন্ন স্তরে এখন সেখানে কাজ করছেন প্রায় ১২শ মানুষ। আর বিক্রির হিসাব ইতিমধ্যেই পেরিয়েছে ১০ লাখ মোটরসাইকেলের ঘর।
এক্সপালস ২০০ সিরিজকে তিনি আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন একটি কারণে—দেশের রাইডারদের চাহিদা আর কেবল দৈনন্দিন যাতায়াতে আটকে নেই। ভ্রমণ আর অ্যাডভেঞ্চার রাইডিংয়ের দিকেও ঝোঁক বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
অ্যাডভেঞ্চার সেগমেন্টের জন্য বাজার প্রস্তুত?
প্রশ্নটির জবাবে চিত্লে সরাসরিই বলেন, বাজার তৈরি। তরুণদের কাছে মোটরসাইকেল এখন আর শুধু যাওয়া-আসার বাহন নয়—সেটি হয়ে উঠেছে তাঁদের জীবনধারা, স্বাধীনতা আর ভ্রমণেরও অংশ। নতুন দুটি মডেল তৈরি হয়েছে সেই রাইডারদের কথা ভেবে, যাঁরা রোজকার চলাচলের পাশাপাশি ট্রেইল কিংবা অফ-রোডেও মোটরসাইকেল চালাতে চান। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের চাহিদাও তৈরি হচ্ছে—এই মুহূর্তে ১০ শতাংশের বেশি গ্রাহক রয়েছেন এই সেগমেন্টে।
মফস্সলে নেটওয়ার্ক
গ্রাহকের কাছাকাছি পৌঁছানোকেই অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। নিলয় মোটরসের মাধ্যমে দেশজুড়ে এখন তাদের ‘টাচপয়েন্ট’ ৫০০টিরও বেশি। বড় শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে সেই নেটওয়ার্ক আরও মজবুত করতে চান তাঁরা। নতুন পণ্যের বেলায় খুচরা যন্ত্রাংশ হাতের নাগালে রাখা আর বিক্রয়োত্তর সেবাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; সে কারণেই যন্ত্রাংশের যথেষ্ট মজুত রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সামনের পরিকল্পনা
বাংলাদেশ নিয়ে হিরোর ভাবনা দীর্ঘমেয়াদি। বাজারের চাহিদা আর নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্যের পোর্টফোলিও আরও সমৃদ্ধ করার কথা বলেন এই সিইও। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এফওয়াই২৬-এ প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক বাজার অংশীদারত্ব ২১ শতাংশ। এইচএফ ডিলাক্স ও স্পেলেন্ডর+ এর মতো পরিচিত মডেলের জোরে এন্ট্রি-লেভেল সেগমেন্টে তাদের দখল ৫৪ শতাংশের বেশি। এক্সট্রিম ১২৫-এর নেতৃত্বে ১২৫ সিসি সেগমেন্টে সেটি ৩০ শতাংশ, আর স্কুটারে ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
রাইডারের নিরাপত্তা, আরাম ও সুবিধা বাড়ায় এমন ফিচার যোগ করে এই অবস্থান ধরে রাখতে চান তাঁরা। পাশাপাশি প্রিমিয়াম সেগমেন্টে নতুন মডেল আনা এবং পুরোনো পোর্টফোলিওকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনাও আছে। বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও স্কুটারের সম্ভাবনাও তাঁরা যাচাই করে দেখছেন—যদিও সে ক্ষেত্রে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলাটাই হবে বড় শর্ত।
গবেষণা ও উন্নয়ন
ভারত ও জার্মানিতে হিরোর নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়নকেন্দ্র আছে। বিশ্বের নানা বাজার থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা সেখানে কাজে লাগানো হয় নতুন পণ্য বানানোর সময়। চিত্লের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ডাকার র্যালি’র মতো কঠিন মোটরস্পোর্ট প্রতিযোগিতা থেকেও শেখার অনেক কিছু থাকে—সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় দুর্গম মরুভূমি আর পাহাড়ি ভূখণ্ডে। সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়েই সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য আরও শক্তপোক্ত, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য মোটরসাইকেল তৈরি করা হয়।
‘হিরোর দেশ’ বলতে কী বোঝায়
‘হিরোর দেশ’ নিছক একটি ক্যাম্পেইনের নাম নয় বলেই দাবি করেন চিত্লে; বরং এটি বাংলাদেশের প্রতি প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারেরই প্রকাশ। গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কটা কেবল মোটরসাইকেল কেনাবেচার মধ্যে আটকে থাকুক, সেটা তাঁরা চান না। রাইডারদের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ আর রাইডিং সংস্কৃতির সঙ্গেও হিরোকে জড়িয়ে রাখতে চান তাঁরা। এখানকার গ্রাহকদের বড় অংশই তরুণ। তাঁর কথায়, ‘আমরা চাই তাঁদের প্রত্যেকে নিজেদের একজন “হিরো” মনে করুন, কারণ তাঁরাও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।’
কমিউটার থেকে প্রিমিয়াম
কমিউটার সেগমেন্টে হিরোর ভিত শক্ত, গ্রাহকের আস্থাও আছে। তবে চাহিদা বদলাচ্ছে—তাই কমিউটারের পাশাপাশি প্রিমিয়াম, স্পোর্টস ও অ্যাডভেঞ্চার সেগমেন্টেও নতুন পণ্য আনার সুযোগ দেখছেন তাঁরা। এক্সপালস ২০০ সিরিজ সেই কৌশলেরই একটা ধাপ।
স্থানীয় উৎপাদনই ভিত্তি
বাংলাদেশে হিরোর কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো স্থানীয়ভাবে উৎপাদন। আমদানির ওপর ভরসা না রেখে দেশেই তৈরি এবং দেশ থেকেই যন্ত্রাংশ সংগ্রহে জোর দিচ্ছেন তাঁরা। এতে একদিকে কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থা মজবুত হয়, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় আরও ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং সাপ্লাই চেইনের দক্ষতাও বাড়ে। এ কারণেই স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকে বাংলাদেশে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তি বলে বর্ণনা করেন হিরো মোটোকর্পের এই প্রধান নির্বাহী।