দেশে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়েছে। সেরে ওঠা শিশুদের অনেকেও ভুগছে হাম-পরবর্তী নানা জটিলতায়। সংক্রমণ ও জটিলতা এখনো থামেনি। শিশুকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে অভিভাবকদের সচেতনতার বিকল্প নেই। হাম নিয়ে ১০টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের শিশু বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. লায়লা বিলকিস।
উপসর্গ কেমন? হামের প্রাথমিক উপসর্গ অন্যান্য সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগের মতোই — জ্বর, কাশি, সর্দি, শারীরিক দুর্বলতা, চোখ লালচে হয়ে যাওয়া বা চোখ থেকে পানি পড়া। জ্বরের তিন থেকে পাঁচ দিন পর দেখা দেয় র্যাশ, যা সাধারণত শুরু হয় শরীরের ওপরের অংশ থেকে। কানের পেছনের ত্বক, চুল ও ত্বকের সংযোগস্থল এবং মুখ থেকে শুরু হয়ে তা ছড়ায় পেট, পিঠ ও হাত-পায়ে। সঙ্গে থাকে চুলকানিও। হাম হলে মুখের ভেতরে একটি বিশেষ দাগ দেখা যায়, রোগী পরীক্ষার সময় যা চিকিৎসকের চোখে পড়ে — এর নাম কপলিক স্পট।
কীভাবে ছড়ায়? হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে; জীবাণু ছড়ায় বাতাসের মাধ্যমে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে তা অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। তাই একই বাড়িতে থাকা অন্যদের মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে জীবাণু। তবে বাড়ির অন্য সদস্যরা আক্রান্ত হবেন কি না, তা নির্ভর করে তাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ওপর।
একবার হলে কি আবার হয়? একবার সংক্রমণ হলে শরীরে হামের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, যা সারা জীবন সুরক্ষা দিতে পারে। টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরও হাম হতে পারে, তবে টিকা নেওয়া থাকলে হাম-পরবর্তী জটিলতা থেকে সুরক্ষা মেলে।
খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম দেখা যায়। কোনো কারণে যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, একবার সংক্রমণের পরও কিংবা টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরও তাঁদের আবার হাম হতে পারে।
বাড়িতে চিকিৎসা সম্ভব? মারাত্মক কোনো জটিলতা না হলে বাড়িতে রেখেই শিশুকে হামের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে থাকতে হবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে; জেনে রাখতে হবে কোন ধরনের উপসর্গে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
গোসল করানো যাবে? হাম হলে গোসলে কোনো বাধা নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুর উপযোগী সাবান-শ্যাম্পুও ব্যবহার করা যাবে, তাতে কোনো ক্ষতি নেই।
অ্যান্টিবায়োটিক লাগে? হাম-পরবর্তী জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে ঠিকই, কিন্তু হামের চিকিৎসা অ্যান্টিবায়োটিক নয়। জটিলতা তৈরি হওয়ার আগে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেও ঝুঁকি এড়ানো যায় না। জটিলতা দেখা দিলেই কেবল পরিস্থিতি বুঝে চিকিৎসক তা সেবনের নির্দেশনা দেন।
কী কী জটিলতা হয়? হামে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়; তখন নানা ব্যাকটেরিয়া মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক শিশুর হতে পারে নিউমোনিয়া, এনকেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ), মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কের পর্দার প্রদাহ), সেপটিসেমিয়া (রক্তে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া), মারাত্মক ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া ও কানের সংক্রমণ। পাঁচ বছরের কম বয়সীদের ঝুঁকি বেশি। হাম-পরবর্তী জটিলতাতেই এ বছর বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কখন হাসপাতালে নিতে হবে? শ্বাসকষ্ট, ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস, শ্বাসের সময় বুকের নিচের অংশ দেবে যাওয়া, খাবার বা তরল খেতে না পারা, অতিরিক্ত ঘুম ভাব, নেতিয়ে পড়া, এলোমেলো কথা বলা, খিঁচুনি, জ্ঞান হারানো, প্রস্রাব কমে যাওয়া, একটানা অতিরিক্ত জ্বর কিংবা অতিরিক্ত ডায়রিয়া — এসব উপসর্গ দেখা দিলে বুঝতে হবে পরিস্থিতি গুরুতর। তখন যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে।