লাইফস্টাইল

অনলাইন কটাক্ষের জবাব তিনটি সেলফিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১:২৭ দুপুর
অনলাইন কটাক্ষের জবাব তিনটি সেলফিতে
ছবি: প্রথম আলো

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও চেহারা নিয়ে ঠাট্টা করার চেয়ে ‘সহজ’ আর ‘জনপ্রিয়’ কাজ সম্ভবত আর একটিও নেই। একটি ছবি, যা খুশি তা-ই মন্তব্য — আর দেখতে দেখতে হাজারো মানুষ সেই বিদ্রূপে যোগ দিয়ে অনলাইন মব তৈরি করে কারও মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া যেন এক মজার খেলা! ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই তখন নিজেকে গুটিয়ে নেন, সরে যান অনলাইন থেকে। মেলিসা ব্লেক করলেন ঠিক উল্টোটা।

ঘটনার শুরু ২০১৯ সালের আগস্টে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেলিসা ব্লেক তখন লেখক-সাংবাদিক হিসেবে বেশ পরিচিত; ‘সিএনএন’, ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ কিংবা ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর মতো গণমাধ্যমে ছাপা হচ্ছে তাঁর লেখা। রাজনৈতিক বিষয়ে একটি মতামত লেখার পর এক রক্ষণশীল ইউটিউবার তাঁর ছবি জুড়ে দিয়ে বানান একটি ভিডিও। তারপর মন্তব্যের ঘরে যা শুরু হলো, তা লেখাকে ঘিরে নয় — চেহারাকে ঘিরে। একজন তো লিখেই বসলেন, ছবি পোস্ট করাই বন্ধ করা উচিত তাঁর, কেননা তিনি ‘অতি কুৎসিত’।

জবাবে মেলিসা পোস্ট করলেন তিনটি সেলফি। পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, বাড়তে থাকে তাঁর অনুসারী, মনোযোগ পান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। কিন্তু তাঁর কাছে এটি নিছক ট্রলের জবাব ছিল না; তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর মুখ নিয়ে এই বিদ্রূপ আসলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন।

মেলিসার জন্ম ১৯৮১ সালে, ফ্রিম্যান-শেলডন সিনড্রোমকে সঙ্গী করে। বিরল এই জেনেটিক অবস্থার কারণে তাঁর মুখমণ্ডলের গঠনে রয়েছে কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য; আলাদা করে ঘাড় নেই, হাত-পা ও বিভিন্ন জয়েন্টের গঠনেও আছে জটিলতা — যার প্রভাব পড়ে চলাফেরা ও স্বাভাবিক নড়াচড়ায়। ৪৫ বছর বয়সী মেলিসাকে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে ২৬ বারের বেশি।

কিন্তু তাঁর গল্পকে কেবল চিকিৎসা বা প্রতিবন্ধিতার গল্প ধরলে বাদ পড়ে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটাই। মেলিসা কখনোই নিজেকে শুধু ‘প্রতিবন্ধী নারী’ পরিচয়ে বেঁধে রাখেননি। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি ছিল তাঁর নিজেকে প্রকাশের ভাষা। ২০০৫ সালে সাংবাদিকতায় পড়াশোনা শেষে ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।

প্রথম কয়েকটি ছবির পর সিদ্ধান্ত নেন, পুরো এক বছর প্রতিদিন একটি করে সেলফি পোস্ট করবেন। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে ছবি তোলা আর পোস্ট করা — ধীরে ধীরে তাঁর কাছে এটি হয়ে ওঠে অনেকটা মানসিক ব্যায়ামের মতো।

যে ছবি একদিন তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়েছিল, সেটিই হয়ে ওঠে আত্মরক্ষার ঢাল। মেলিসা লিখেছিলেন, ‘আমি কেমন দেখতে, তা নিয়ে আপনার মত থাকতে পারে। কিন্তু আমি দৃশ্যমান হব কি না, সেই সিদ্ধান্ত আমার।’

#MyBestSelfie নামের এই উদ্যোগে যোগ দেন আরও অনেকে, যাঁরা নিজেদের এমন সব বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেন যা আগে লুকাতে চাইতেন। একটি ব্যক্তিগত প্রতিবাদ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সামাজিক আন্দোলনের ভাষা।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের নিয়ে সমাজে রয়েছে এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব — তাঁদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হয়, অথচ তাঁদের স্বাভাবিক উপস্থিতি অনেক সময়ই তৈরি করে অস্বস্তি।

কৈশোরে ফ্যাশন ম্যাগাজিনে নিজের মতো দেখতে কাউকে খুঁজে পাননি মেলিসা। এখান থেকেই তাঁর উপলব্ধি — দৃশ্যমানতা মানে কেবল ছবি তোলা নয়, বরং সমাজের সামনে নিজের অস্তিত্বকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

মেলিসার বক্তব্য, অ্যাবলিজম বা প্রতিবন্ধীবিদ্বেষী মনোভাব ভাঙতে হলে প্রতিবন্ধী মানুষদের চোখের সামনে থাকতে হবে। তাঁর তোলা প্রতিটি ছবি যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দিচ্ছিল — এই সমাজে তাঁরাও আছেন, তাঁরাও এর অংশ।

দৃশ্যমান হওয়ার পরও অবশ্য ট্রল থামেনি। ২০২০ সালে টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ‘নিউ টিচার চ্যালেঞ্জ’-এ কিছু অভিভাবক শিশুদের ভয় দেখাতে ব্যবহার করতেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির ছবি; শিকার হয় মেলিসার ছবিও। তিনি নিজে টিকটক ব্যবহার করতেন না, অনুসারীরাই তাঁকে বিষয়টি জানান।

এবারও চুপ থাকেননি তিনি। প্রকাশ্যে বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের ছবি শিশুদের ভয় দেখানোর উপকরণ বানানো নিছক মজা নয় — এর পেছনে ভিন্ন চেহারার মানুষকে ‘স্বাভাবিক’-এর বাইরে ‘বীভৎস ভয়ের ব্যাপার’ হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলা হয়।

২০২৪ সালে বেরোয় তাঁর বই ‘বিউটিফুল পিপল: মাই থার্টিন ট্রুথস অ্যাবাউট ডিজঅ্যাবিলিটি’। বইটিতে উঠে এসেছে প্রতিবন্ধিতা ও অ্যাবলিজমের প্রসঙ্গ, আত্মচিত্রের কথা, আর জনপ্রিয় সংস্কৃতি থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। সেখানে তাঁর প্রশ্ন — বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে হয় করুণার পাত্র, নয়তো ‘অসাধারণ নায়ক’ বানিয়ে দেখানো হয় কেন? নিছক সাধারণ মানুষ হিসেবে কেন নয়?

সৌন্দর্যকে আমরা প্রায়ই বেঁধে ফেলি একটি নির্দিষ্ট মাপে — নির্দিষ্ট মুখের গড়ন, গায়ের রং, শরীরের আকার আর বয়সে। যিনি সেই মানদণ্ডে পড়েন না, তাঁকে বলা হয় ‘ভিন্ন’, কখনো সরাসরিই ‘কুৎসিত’। এই ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে মেলিসা নিজেকে বদলাননি; বরং যেমন আছেন সেভাবেই এসেছেন সামনে, আর প্রশ্ন তুলেছেন সেই মাপকাঠিটি নিয়েই।

যেখানে তাঁকে ‘চেহারা খারাপ হওয়ার’ লজ্জা ও অপমান নিয়ে লুকিয়ে যেতে বলা হয়েছিল, সেখানে নিজের স্বাভাবিক চেহারা নিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন আরও দৃশ্যমান। যে ছবি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেটিকেই বারবার শক্তি ও সাহস বানিয়ে সামনে এনেছেন সমাজের প্রচলিত ‘শেমিং’ ধারণা ভেঙে দিতে। মেলিসা যে তাতে সফল, তাঁর এই গল্পই তার প্রমাণ।

সূত্র: মেলিসা ব্লেকের ব্লগ

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

অনলাইনে একটি ছবি, তারপর এক দিনেই ১৫টি অর্ডার

অনলাইনে একটি ছবি, তারপর এক দিনেই ১৫টি অর্ডার