কক্সবাজার শহরের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প (শহর রক্ষা বাঁধ) বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ; অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। প্রকাশ্যে বালিয়াড়ি ভরাট ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে সড়ক নির্মাণকে আদালত অবমাননার শামিল উল্লেখ করে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ চারজনকে নোটিশ পাঠিয়েছেন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (এইচআরপিবি)-এর চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
নোটিশ পেয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী, সড়ক নির্মাণকাজের প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রাশেদুর রহমান ও জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি তাকাহাসকি জানকো। নোটিশে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্মাণকাজ বন্ধ না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হবে।
বৃহস্পতিবার ই-মেইল ও ডাকযোগে নোটিশ পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেছেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত দেশের অমূল্য সম্পদ। প্রতিবেশ সংকটাপন্ন (ইসিএ) এই সৈকতের বালিয়াড়ি দখল বা ভরাট করে যেকোনো স্থাপনা নির্মাণে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই সুগন্ধা সৈকত থেকে কলাতলীর দিকে চার লেনের স্থায়ী সড়ক নির্মিত হচ্ছে, যাতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের শঙ্কা রয়েছে। কাজ বন্ধ না হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।
কয়েক দিন আগে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে দক্ষিণে কলাতলী পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার ‘শহর রক্ষা বাঁধের’ কাজ শুরু হয়। সড়কটির প্রস্থ হবে ২৮ মিটার। এই কাজের বিপরীতে জাইকা বরাদ্দ দিয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম ধাপ শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে সায়মান বিচ রিসোর্ট থেকে দক্ষিণে বেলি হ্যাচারি পর্যন্ত আরও ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)।
এ প্রসঙ্গে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই কাজ হচ্ছে। প্রকল্পটি আগেই একনেকে পাস হয়েছে; জরিপ-নকশা ও গবেষণাও করা হয়েছে। এতে পরিবেশের তেমন ক্ষতি হবে না বলে দাবি তাঁর।
এদিকে সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ নিয়ে ফুঁসে উঠেছে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন। তাদের দাবি, বালিয়াড়ি ভরাট করে নির্মিত এই সড়ক টিকবে না — মেরিন ড্রাইভের মতো একসময় সমুদ্রের জোয়ারের ধাক্কায় বিলীন হবে। এ ছাড়া প্রকল্পটি হলে ধ্বংস হবে লাল কাঁকড়া, উপকূল রক্ষার সাগরলতা ও জীববৈচিত্র্য।
নির্মাণকাজ বন্ধের দাবিতে গত রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর স্মারকলিপি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। এরপর ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণের কৈফিয়ত চেয়ে প্রকল্প পরিচালক ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অন্যদিকে পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণ কেন বন্ধ হবে না — তার কারণ জানতে চেয়ে দুই সচিবসহ আট সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ জানাতে বলা হয়েছে; না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্মাণকাজ স্থগিত চেয়ে মানববন্ধন
সড়ক প্রকল্প বন্ধের দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার পৌরসভার ভবন চত্বরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কয়েকটি সংগঠন।
‘ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট কক্সবাজারের’ ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেন ক্লাইমেট জাস্টিস বাংলাদেশের মুখপাত্র মো. জাবেদ নূর শান্ত, ভয়েস অব কক্সবাজার ভলান্টিয়ারের সভাপতি মো. কামরুল হাসান, ইয়ুথ অ্যালায়েন্স ফর সাসটেইনেবল ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী প্রধান কায়সার হামিদ, জলবায়ু যোদ্ধা ও ম্যাজিক ইনিশিয়েটিভের সভাপতি জিমরান মো. সায়েক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কক্সবাজারের সাবেক আহ্বায়ক এস এস সাগর প্রমুখ।
মুখপাত্র জাবেদ নূর শান্ত বলেন, ‘কক্সবাজারের উন্নয়ন আমরাও চাই। কিন্তু প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট কিংবা দখল করে নয়। ২০ মিনিট বৃষ্টি হলে পুরো শহর ডুবে যায়, জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে, সড়কের নালা ড্রেনগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। জলাবদ্ধতার নিরসনে কোনো প্রকল্প নেই।’
সমাবেশ শেষে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে সুগন্ধা সড়ক নির্মাণকাজ স্থগিত ও নকশা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বরাবর স্মারকলিপি পাঠানো হয়।