ধর্ম

প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন হয়, ইসলাম যা বলে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ৮:৩৬ সকাল
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন হয়, ইসলাম যা বলে
ছবি: প্রথম আলো

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত বিপর্যয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও তীব্রতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল মানুষের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন জাগে — এসব দুর্যোগকে ইসলাম ঠিক কীভাবে দেখে?

পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে উত্তর খুঁজলে সামনে আসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিক।

পরীক্ষা ও সতর্কবার্তা

ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব জীবন মূলত একধরনের পরীক্ষা। কখনো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দিয়ে, কখনো কঠিন বিপদ-আপদের মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করা হয় মানুষকে। বন্যা, ঝড় কিংবা ভূমিকম্পের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা একজন মুমিনের ধৈর্য, ইমান ও আল্লাহর প্রতি আস্থার পরীক্ষা।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছুটা ভয় ও ক্ষুধা এবং সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)

মানুষ যখন নিজের সামরিক শক্তি, বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, তখন প্রকৃতির একটি ছোট আঘাতই তাকে মনে করিয়ে দেয় নিজের চরম সীমাবদ্ধতার কথা।

কোরআনে এসব ঘটনাকে মানব-মনস্তত্ত্বের জন্য আল্লাহর বিশেষ সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘আর আমরা নিদর্শনসমূহ প্রেরণ করি শুধু ভীতি প্রদর্শনের জন্য।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৫৯)

অর্থাৎ দুর্যোগ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সে সর্বশক্তিমান নয়; তাকে ফিরে যেতে হবে স্রষ্টার দিকেই।

পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব

মানুষের হাতের কামাই ও সামাজিক অবক্ষয়ের সঙ্গে কিছু জাগতিক বিপর্যয়ের গভীর সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেছে পবিত্র কোরআন।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ৪১)

এই আয়াতের আলোকে সমাজতাত্ত্বিক আলেমরা বলেন, মানুষের অন্যায়, সামাজিক অবিচার, দুর্নীতি ও নৈতিক পতন সমাজে ডেকে আনে নানা মানবিক সংকট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়।

আজকের বিশ্বে অনেক দুর্যোগের পেছনেই সরাসরি ভূমিকা রাখছে মানুষের পরিবেশ-বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। নির্বিচারে বন উজাড়, নদী দখল, যত্রতত্র পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ধ্বংস করছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

কোরআনে আল্লাহ-তাআলা স্পষ্ট নিষেধ করে বলেছেন, ‘পৃথিবীকে সংশোধনের পর তোমরা তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৫৬)

এ কারণেই পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল একজন নাগরিকের সাধারণ দায়িত্ব নয়; এটি ইসলামের অন্যতম বড় সামষ্টিক ইবাদতও বটে।

কোরআন ও হাদিসে অতীতের কিছু অবাধ্য জাতির ওপর আল্লাহর শাস্তি হিসেবে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসার কথা রয়েছে (সুরা আরাফ, আয়াত: ৬৪)। তবে বর্তমান যুগের কোনো নির্দিষ্ট বন্যা, ভূমিকম্প বা ঝড়কে আল্লাহর ‘শাস্তি’ বলে নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করার অধিকার বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান মানুষের নেই। একজন মুমিনের জন্য বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়া ও নিজের অবস্থার সংশোধন করা।

দুর্যোগে নিহতদের জন্য সুসংবাদ

ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে কেবল ধৈর্যের শিক্ষাই দেয়নি; আকস্মিক বিপর্যয়ে নিহতদের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ পারলৌকিক মর্যাদাও।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘শহীদ পাঁচ প্রকার: মহামারি বা প্লেগে মৃত ব্যক্তি, পেটের রোগে মৃত ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং আল্লাহর পথে শহীদ ব্যক্তি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮২৯)

এই হাদিস প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে নিহত মানুষের শোকার্ত পরিবারের জন্য গভীর সান্ত্বনা ও আশার বার্তা।

দুর্যোগের তীব্র আশঙ্কায় মহানবী (সা.) আশ্রয় প্রার্থনা করতেন আল্লাহর কাছে। প্রবল ও ক্ষতিকর বৃষ্টি হলে তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমাদের চারপাশে বর্ষণ করুন, আমাদের ওপর নয়; পাহাড়, টিলা, উপত্যকা ও বৃক্ষরাজির ওপর বর্ষণ করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০১৩) তাই দুর্যোগের সময় দোয়া, ইস্তিগফার ও তওবাই মুমিনের প্রধান আত্মিক আমল।

প্রস্তুতি ও মানবিক তৎপরতা

তকদিরে বিশ্বাসের পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ ও বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা অবলম্বনেরও নির্দেশ দেয় ইসলাম। নিরাপদ ঘরবাড়ি নির্মাণ, আগাম সতর্কব্যবস্থা এবং দুর্যোগপূর্ব টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জরুরি।

তাওয়াক্কুলের প্রকৃত স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাস্তব উপায় অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আগে তোমার উটটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)

দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় ইসলামি দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুর্গতদের খাদ্য, চিকিৎসা, বস্ত্র, আশ্রয় ও পুনর্বাসনে আর্থিক সহযোগিতা করা কেবল মানবিক কাজ নয়; মহান আল্লাহর কাছেও অত্যন্ত প্রিয় আমল।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাঁর বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯) দুর্যোগের সময় মানুষের কষ্ট লাঘবে নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে এগিয়ে আসাই ইসলামের প্রকৃত মানবিক চেতনার সামাজিক প্রকাশ।

  • সাব্বির খান আযহারী: শায়খুল হাদিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল আরকাম আল ইসলামিয়া, ঢাকা

সূত্র: প্রথম আলো

৬ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

নিশাপুর: যে শহরে জন্ম বহু মুসলিম মনীষীর

নিশাপুর: যে শহরে জন্ম বহু মুসলিম মনীষীর