ধর্ম

‘পড়ো’: প্রথম ওহির সৌন্দর্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৬, ১:৫২ রাত
‘পড়ো’: প্রথম ওহির সৌন্দর্য
ছবি: প্রথম আলো

মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নেমেছিল সুরা আলাকের পাঁচটি আয়াতের মধ্য দিয়ে। ছোট এই পাঁচ আয়াতেই ধরা আছে ইসলামের জ্ঞানভাবনা, মানুষের মর্যাদা, স্রষ্টার পরিচয় আর আত্মশুদ্ধির মূল সুরটি।

আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘পড়ো, তোমার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১-৫)

জ্ঞানের শুরু প্রতিপালকের নামে

ওহির একেবারে গোড়ার নির্দেশটিই ‘পড়ো’। তবে এখানে পড়া মানে কেবল তথ্য জমানো নয় — নির্দেশটির সঙ্গেই বসানো হয়েছে ‘তোমার প্রতিপালকের নামে’ কথাটি। এতেই বোঝা যায়, ইসলামে জ্ঞানচর্চা স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যাপার নয়। জ্ঞান মানুষের হাতে তুলে দেয় শক্তি; সেই শক্তি কোন পথে খরচ হবে, তা ঠিক করে দেয় আল্লাহর কাছে জবাব দেওয়ার বোধটুকু।

ইতিহাস সাক্ষী, যে জাতি জ্ঞানকে এই দায়বোধ থেকে আলাদা করে ফেলেছে, তাদের হাতেই একদিন জ্ঞান হয়ে উঠেছে নিপীড়নের অস্ত্র। প্রথম বাক্যেই জ্ঞানের সঙ্গে নিজের নাম গেঁথে দিয়ে সেই পথটিই বন্ধ করে দিয়েছেন আল্লাহ।

মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য

এরপরের বাক্যটি মানুষকে চিনিয়ে দেয় তার নিজের শিকড়। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্তপিণ্ড থেকে।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ২)

উন্নতির শিখরে উঠলেও মানুষের শুরুটা ছিল নিতান্ত ক্ষুদ্র। সভ্যতা তাকে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখায় বটে, কিন্তু এই আয়াত মনে করিয়ে দেয় মাটির সঙ্গে তার নাড়ির টানের কথা।

নিজের এই ক্ষুদ্র সূচনার কথা মনে থাকলে চিন্তায় একধরনের ভারসাম্য থেকে যায়। তখন প্রতিটি অর্জনেই আল্লাহর অনুগ্রহের কথা মনে পড়ে, নিজের কৃতিত্বের অহংকার মাথায় চড়ে বসতে পারে না।

শিক্ষার প্রকৃত উৎস

তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে জ্ঞানকে দেখানো হয়েছে আল্লাহর বিশেষ দান হিসেবে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পড়ো, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ৩-৪)

এখানে কলম নিছক লেখার সরঞ্জাম নয়। জ্ঞান অর্জন, তা সংরক্ষণ, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়া, সভ্যতার স্মৃতি ধরে রাখা — সবকিছুরই প্রতীক এটি। লিখে রাখা একটি বাক্য শত বছর পরও কাউকে জাগিয়ে তুলতে পারে; একটি বই বদলে দিতে পারে বহু প্রজন্মের জীবন।

ইসলামে তাই কলমের মর্যাদা সত্য ও কল্যাণের বাহন হিসেবেই। সোনালি যুগে গ্রন্থাগার, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও জ্ঞানচর্চা এত গুরুত্ব পেয়েছিল এ কারণেই।

মানুষের জ্ঞানের প্রকৃতি

পঞ্চম আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ৫)

জন্মের সময় মানুষ কিছুই জানে না। তার জ্ঞান অর্জিত, সীমিত, ক্রমে বাড়তে থাকা। আজকের অজানা কাল হয়তো ধরা দেবে; অথচ জানার পরিধি যত বাড়ে, অজানার বিশালতাও তত চোখে পড়তে থাকে।

প্রকৃত জ্ঞান তাই কাউকে ‘সব জানি’ বলার স্পর্ধা দেয় না — বরং শেখায় নিজের অজ্ঞতার সীমাটুকু চিনতে।

প্রথম ওহির সৌন্দর্য

প্রথম ওহির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই — জ্ঞান এখানে এসেছে ইমানের ছায়া নিয়ে। পড়া হোক, সৃষ্টি হোক, কলম কিংবা শিক্ষা — প্রতিটির সঙ্গেই জুড়ে আছে স্রষ্টার পরিচয় ও তাঁর অনুগ্রহের কথা। এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামের শিক্ষাভাবনা কেবল মেধাবী নয়, বিবেকবান মানুষ গড়ার কথা বলে।

আজকের দুনিয়ায় তথ্যের অভাব নেই; হাতের মুঠোয় মুহূর্তেই চলে আসে অজস্র তথ্য। প্রযুক্তির এই জোয়ার মানুষকে দ্রুতগামী করেছে সন্দেহ নেই, কিন্তু সঙ্গে করে এনেছে অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা আর নৈতিক দিশাহীনতাও।

‘পড়ো’ ডাক দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই দ্বীন মানুষকে কেবল পাঠক বানাতে চায়নি; চেয়েছে সে হয়ে উঠুক সত্যান্বেষী, জ্ঞানের বাহক আর স্রষ্টার অনুগত।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

কোরআন শেখার শুরু হয় যেভাবে

কোরআন শেখার শুরু হয় যেভাবে