ধর্ম

নবীজির রওজায় হাজির হওয়ার আদব

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ আগস্ট ২০২৬, ৪:৫৫ ভোর
নবীজির রওজায় হাজির হওয়ার আদব
ছবি: প্রথম আলো

মদিনা মুনাওয়ারা — যে মাটির ধূলিকণায় আঁকা রাসুল (সা.) ও তাঁর মহান সাহাবিদের পদচিহ্ন, যে নগরী থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল তাওহিদের আলো — সেখানে উপস্থিত হওয়া একজন মুমিনের জীবনে পরম সৌভাগ্যের বিষয়। মক্কায় গিয়ে রাসুলের পবিত্র রওজা জিয়ারতের সুযোগ হাতছাড়া করা তাই অত্যন্ত বেদনার।

জিয়ারতের গভীর গুরুত্ব তুলে ধরে হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার রওজা জিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফায়াত অবধারিত হয়ে গেল’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস: ২৬৯৫)

মদিনার পথে যাত্রা শুরুর মুহূর্ত থেকেই অন্তরে নবীপ্রেম ও শ্রদ্ধা জাগ্রত রাখা বাঞ্ছনীয়। পুরো পথে অধিক পরিমাণে দরুদ শরিফ পাঠ, ইস্তিগফার আর আত্মশুদ্ধির ভাব বজায় রাখাই এই সফরের প্রধান পাথেয়।

ইসলামের মনীষীরা এই পুণ্যভূমিতে প্রবেশের সময় বজায় রাখতেন গভীর বিনম্রতা। বর্তমানে উড়োজাহাজ, দ্রুতগতির ট্রেন বা বাসে যাতায়াত স্বাভাবিক বিষয়; কিন্তু বাহন যা-ই হোক, অন্তরের অবস্থান যেন সব সময় শ্রদ্ধা, বিনয় ও সমর্পণে পূর্ণ থাকে।

মদিনায় পৌঁছে দুনিয়াবি অনর্থক কথাবার্তা ও কোলাহল এড়িয়ে অন্তরকে আল্লাহর জিকির ও দরুদে নিবিষ্ট রাখা উচিত। উত্তম ও পরিচ্ছন্ন পোশাকে মসজিদে নববিতে প্রবেশ করা সুন্নাহ।

মসজিদে নববির অনন্য মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার এই মসজিদে এক রাকাত নামাজ আদায় করা অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার রাকাত নামাজ আদায়ের চেয়েও উত্তম; কেবল মসজিদে হারাম ছাড়া।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৯০)

এই মসজিদের ভেতরেই রয়েছে পৃথিবীর বুকে বেহেশতের এক টুকরা অংশ — ‘রিয়াজুল জান্নাহ’। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার ঘর ও আমার মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি বেহেশতের একটি অন্যতম বাগান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৯৬)

এই বরকতময় স্থানে নফল নামাজ ও দোয়ার সুযোগ পাওয়া পরম সৌভাগ্যের। তবে সেই সুযোগ পেতে গিয়ে কোনোভাবেই ধাক্কাধাক্কি করা কিংবা অন্য কোনো মুসল্লিকে সামান্যতম কষ্ট দেওয়া যাবে না। কারণ ইবাদতের মূল সৌন্দর্যই স্থিরতা, বিনম্রতা ও পারস্পরিক সম্মানে।

মসজিদে নববিতে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়ের রয়েছে বিশেষ ফজিলত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আমার মসজিদে একাধারে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করবে এবং কোনো ওয়াক্ত ছুটে যাবে না, তার জন্য জাহান্নাম ও আজাব থেকে মুক্তি এবং মুনাফেকি থেকে নিষ্কৃতি লিখে দেওয়া হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৫৮৩)

রওজা মুবারকের সামনে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি প্রত্যেক মুমিনের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্পর্শকাতর সময়। সেখানে দাঁড়িয়ে চরম ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে, নিম্নস্বরে রাসুলের প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করতে হবে।

নববি দরবারের আদব শেখাতে গিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর কণ্ঠের ওপর নিজেদের কণ্ঠ উঁচু কোরো না...’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ২)

অতএব রওজার সামনে উচ্চবাচ্য করা, ছবি বা সেলফি তোলার উন্মাদনায় মগ্ন হওয়া কিংবা পেছনের মানুষকে ঠেলে ভিড় তৈরি করা কঠোরভাবেই পরিহার করতে হবে।

রাসুলকে সালাম পেশের পর পাশে শায়িত ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক ও দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের (রা.) প্রতিও সম্মান ও সালাম জানানো জিয়ারতেরই অন্তর্ভুক্ত।

মদিনা সফরের প্রকৃত সার্থকতা কেবল আবেগ প্রকাশ বা স্মৃতি রোমন্থনে সীমাবদ্ধ নয়; এই সফরের মূল লক্ষ্য জীবনকে রাসুলের আদর্শে নতুন করে ঢেলে সাজানো।

মদিনা থেকে ফেরার পর যদি কারও চরিত্রে বিনম্রতা না আসে, নামাজে অবহেলা দূর না হয় এবং আচরণে সুন্নাহর প্রতিফলন না ঘটে, তবে সফরের আত্মিক উদ্দেশ্য অপূর্ণই থেকে যায়।

মদিনা আমাদের শেখায় — নবীপ্রেম নিছক কথার ফুলঝুরি নয়, নবীপ্রেম হলো সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুবর্তন। রওজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে অশ্রু ঝরার চেয়েও বড় প্রমাণ হলো ঘরে ফিরে নববি আখলাকে নিজের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করা।

  • আহমাদ সাব্বির: লেখক ও গবেষক

সূত্র: প্রথম আলো

৩ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)