রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে সাবেক চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের মালিকানাধীন ‘ইকবাল সেন্টার’ ছেড়ে তেজগাঁওয়ের শান্তা পিনাকলে চলে গেছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। শান্তা পিনাকল দেশের প্রথম ৪০ তলা ভবন; দেশের সবচেয়ে উঁচু ও দৃষ্টিনন্দন এই ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৬ সালের এপ্রিলে।
এই স্থানান্তরে ব্যাংকটির বছরে সাশ্রয় হবে ৫৫ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, নিজের ভবনের জায়গা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংককে ভাড়া দিয়ে বাজারের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করে আসছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এইচ বি এম ইকবাল — ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। টানা ২৬ বছর প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি ছেড়ে দেন তিনি। এরপর নতুন পরিচালনা পর্ষদ বিষয়টি জানতে পেরে ভবন ছেড়ে নতুন জায়গায় যাওয়ার উদ্যোগ নেয়। তাঁর সংশ্লিষ্টতা থাকায় ব্যাংকটির গুলশান ও বারিধারা শাখাও সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফলে ভবন ভাড়া বাবদ খরচ অর্ধেকে নেমে আসবে বলে মনে করছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা ব্যাংকটিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। এ জন্য কর্মপরিবেশ উন্নত করতে প্রধান কার্যালয়সহ একাধিক শাখা স্থানান্তর করা হচ্ছে। আগে ভবনের ভাড়া অনেক বেশি দিতে হতো। এখন তা কমে আসছে। এতে ব্যাংকটির কর্মপরিবেশ উন্নত হবে। পাশাপাশি খরচও কমে আর্থিক সূচকের উন্নতি ঘটবে।’
খরচ কমল কত
ব্যাংকটির নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বনানীর ইকবাল সেন্টারের ২২ তলা ভবনের ১৯ তলায় ১ লাখ ২২ হাজার বর্গফুট জায়গার ভাড়া দিত তারা। প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ছিল ৫০৬ টাকা, সঙ্গে প্রতি বর্গফুটে মাসে ৫০ থেকে ৬০ টাকা সেবা মাশুল। এতে মাসে ভাড়া দাঁড়াত ৬ কোটি ১৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা, বছরে ৭৪ কোটি ৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
চলতি মাস থেকে শান্তা পিনাকলে গেছে প্রধান কার্যালয়। ভবনটির সাত তলায় ১ লাখ ১ হাজার ৯২০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নিয়েছে ব্যাংকটি, প্রতি বর্গফুটে ভাড়া ১৫০ টাকা ও সেবা মাশুল ২০ টাকা। ফলে মাসে দিতে হবে ১ কোটি ৫২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে খরচ কমছে ৪ কোটি ৬৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা, বছরে ৫৫ কোটি ৭৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা।
ইকবাল সেন্টার ছাড়তেও বাধা
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনজুর মফিজ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে দেওয়া এক চিঠিতে জানিয়েছেন, গত ২ আগস্ট ইকবাল সেন্টার ছেড়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সার্ভার শান্তা পিনাকলে নেওয়ার জন্য দুটি ট্রাক ভাড়া করা হয়। ওই দিন রাত ৮টার দিকে ৩০ থেকে ৪০ জন বহিরাগত ট্রাক দুটির চাবি নিয়ে নেয়। তাদের চাপে পরে সব মালামাল ফিরিয়ে নেওয়া হয় ১০ তলার প্রযুক্তি বিভাগে। এরপর ২০-২৫ জনের অজ্ঞাতনামা একটি দল ইকবাল সেন্টারের ১৪ তলায় চেয়ারম্যান আরিফুর রহমানের কক্ষে জোর করে ঢোকার চেষ্টা করে; তখন তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয় এমডির কক্ষে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কেউ সাড়া দেননি। রাত ১০টার দিকে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করলে একজন এসআই ও দুজন কনস্টেবল ঘটনাস্থলে আসেন; এরপরই প্রধান কার্যালয় ত্যাগ করেন চেয়ারম্যান।
আরিফুর রহমান বলেন, ‘ইকবাল সেন্টারে আমাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কোনোরকমে বেঁচে গিয়েছি। ভবনটি ছেড়ে ব্যাংকের সবাই একরকম বেঁচে গিয়েছে।’
এদিকে প্রিমিয়ার ব্যাংকে এইচ বি এম ইকবালের একাধিক বেনামি ঋণের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক; এসব অর্থ দুবাই ও মালয়েশিয়ায় পাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তথ্য অনুযায়ী, প্রিমিয়ার গ্রুপের অনিয়মের অভিযোগে এ পর্যন্ত ১৬টি মামলা হয়েছে, যেসবের আসামি এইচ বি এম ইকবাল, তাঁর দুই ছেলে, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। গত সপ্তাহে তাঁর কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সেটি সিলগালা করেছে দুদক।