আন্তর্জাতিক

জলবায়ু পরিবর্তনে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ৪:০১ বিকেল
জলবায়ু পরিবর্তনে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে
ছবি: প্রথম আলো

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, বাড়ছে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি। নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে তেমনই এক হিমবাহ ধস ও বন্যায় প্রাণ গেছে অন্তত ৩৫৯ জনের। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনেরই ফল।

বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ, যাঁদের অন্তত ৮০০ জন বিদেশি। আগের দিন হিমবাহ ধসে মাটি ও পাথরের বিশাল একটি অংশ হিমালয়ের একটি নদীতে আছড়ে পড়ে; এর পরপরই প্রলয়ংকরী বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যায় উপত্যকা ও পাহাড়ি জনপদ।

আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।’ এর ফলেই হিমবাহ ধস এবং চলতি সপ্তাহের মতো একের পর এক দুর্যোগ বারবার ঘটছে বলে জানান তিনি।

বুধবারের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ জানতে বিশ্লেষণ এখনো চলছে। তবে বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, নেপালের ‘লাংটাং লিরুং’ চূড়ার উত্তর ঢালে একটি বিশাল হিমশিলা ধসে পড়ে; সেই ধস তিব্বত অংশের ‘লেন্দে খোলা’ নদীতে আছড়ে পড়লেই সূত্রপাত হয় বিপর্যয়ের।

প্রথম ধসের পর শুরু হয় ধারাবাহিক বিপর্যয়। সীমান্তজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, ধ্বংস হয়েছে জিরং স্থলবন্দরের বাণিজ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো। শুধু তা-ই নয়, ভারত সীমান্তের কাছাকাছি ভাটির ১০০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় নদীর গতিপথও প্রভাবিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনই একমাত্র ও তাৎক্ষণিক কারণ নয়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়া যে বড় ভূমিকা রেখেছে, তা-ও মনে করছেন তাঁরা।

সাইমন কক্স জানান, তাপমাত্রা বাড়লে খাড়া ঢালে বরফের বাঁধন দুর্বল হয়ে যায়, বাড়ে গলিত বরফের পানির প্রবাহ। বদলে যায় বরফ জমাট বাঁধা ও গলে যাওয়ার চক্র এবং বৃষ্টির ধরনও। এসব কারণেই পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে, কিছু জায়গায় ধসের ঘটনা বেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অঞ্চলে বারবারই এমন বিপর্যয় আঘাত হেনেছে, যদিও সেগুলোর মাত্রা ছিল তুলনামূলক ছোট। এর মধ্যে রয়েছে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরংয়ে ২০২৫ সালের বন্যা, ২০২৪ সালে শেরপাদের থামে গ্রামে হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণ এবং ২০২৩ সালে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমের দুর্যোগ।

পুরো হিন্দুকুশ পর্বতমালাজুড়েই বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে, বাড়ছে সেসবের তীব্রতাও। নেপালভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড) জানিয়েছে, পানি, ভূমি ও আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন এই অঞ্চলের মানুষকে ফেলেছে চরম ঝুঁকির মুখে।

ইসিমোডের জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজম বলেন, পাহাড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় পৃথিবীর বরফাবৃত অংশ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাঁর ধারণা, অতিরিক্ত তুষার গলে যাওয়ার পাশাপাশি ভূকম্পনের কারণেই সম্ভবত হিমশিলার প্রাথমিক ধস নেমেছিল, আর তা থেকেই বুধবার ভাটিতে একের পর এক আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।

হিমালয়ের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রটিও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো হারিয়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ। সংস্থাটি তখন আরও জানায়, আগের দশকের তুলনায় বিগত দশকে ৬৫ শতাংশ হারে দ্রুত গলেছে নেপালের হিমবাহগুলো।

হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেঞ্জামিন হর্টন বলেন, বুধবারের দুর্যোগটি অনেকগুলো ঘটনার সম্মিলিত প্রভাবে সংঘটিত বিপর্যয়ের একটি বড় উদাহরণ।

ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ ক্ষয়, বরফ জমা মাটি গলে যাওয়া ও পাহাড়ি ঢালের ভারসাম্য দুর্বল হওয়া — এসবের সঙ্গে যখন ভূমিকম্প যুক্ত হয়, তখনই এমন ঘটনা ঘটে। ফলে একক কোনো কারণে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে সামগ্রিক ক্ষতি হয় অনেক বেশি জটিল ও ধ্বংসাত্মক।

উচ্চ পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এ ধরনের ধারাবাহিক ঝুঁকির ধরন বোঝা অত্যন্ত জরুরি বলেও জোর দিয়েছেন হর্টন।

সূত্র: প্রথম আলো

৫ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

ব্রুকলিনে গুলিতে নিহত ইউসুফের পাঠানো টাকায় চলত পরিবার

ব্রুকলিনে গুলিতে নিহত ইউসুফের পাঠানো টাকায় চলত পরিবার