পুলিশ, র্যাব, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের হাতে একজন নাগরিকের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তিনি অভিযোগ জানাতে পারেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আশা করবেন, অভিযোগটির তদন্ত হবে স্বাধীনভাবে—সাক্ষ্য নেওয়া হবে, নথিপত্র জোগাড় হবে, ঘটনাস্থল ঘুরে দেখা হবে, প্রমাণ যাচাই হবে। অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা আর ভুক্তভোগীর জন্য ক্ষতিপূরণের সুপারিশ আসবে।
কিন্তু ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় এই সুরক্ষাটুকু পাওয়ার উপায় নেই। কারণ অভিযোগটি যদি কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে হয়, কমিশন নিজে থেকে স্বাধীনভাবে তদন্তে নামতে পারবে না। প্রথমে তাকে ঘটনার প্রতিবেদন চাইতে হবে অভিযুক্ত বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছেই। খসড়াটি ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির জন্ম এখানেই।
যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য প্রথমে তারই দরজায় যেতে হলে কমিশনের স্বাধীন তদন্তের জায়গাটা থাকে কোথায়? গত ১০ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া খসড়াটি পড়লে এই বৈপরীত্য চোখে পড়ে। খসড়াটি এখন বিল আকারে জাতীয় সংসদে ওঠার কথা।
২০০৯ সালের আইনের তুলনায় খসড়াটিকে কিছুটা ভালো বলা হচ্ছে বটে, তবু প্রশ্নটি থেকেই যায়—স্বাধীন তদন্তের একেবারে শুরুতেই কেন কমিশনকে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন আর পদক্ষেপের জন্য বসে থাকতে হবে?
আরও বড় কথা, ১৯ ধারার শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছে—আইনের অন্য যেকোনো বিধানে যা-ই থাকুক, শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে চলবে এই বিশেষ পদ্ধতিই। ফলে সাধারণ অভিযোগে কমিশনকে দেওয়ানি আদালতের মতো যে সাক্ষী তলব, দলিল চাওয়া, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে শুরু থেকেই সেই ক্ষমতা খাটানো যাবে কি না—তা নিয়েও গুরুতর আইনি প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায়।
২০২৫-এর অধ্যাদেশ যা দিয়েছিল
এখানেই সামনে আসে নতুন আইনের সঙ্গে ২০২৫ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের একটি বড় ফারাক। ওই অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কমিশনকে সরাসরি স্বাধীন অনুসন্ধান ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) বলেছে, ওই ক্ষমতা বহাল রাখা উচিত ছিল। অর্থাৎ ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ কমিশনের হাত খুলে দিয়েছিল, আর ২০২৬ সালের খসড়া আবার সেই হাত বেঁধে দিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘এ আইনে আমাদের প্রত্যাশা পূরণে ঘাটতি থেকে যাবে। শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের এখতিয়ার না রাখায় মানবাধিকারের মৌলিক চেতনাই অগ্রাহ্য হবে।’ টিআইবিও সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ২০০৯ সালের আইনের বিতর্কিত বিধান বহাল রেখে কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছে।
ক্ষমতা বাড়ছে, কোথায়
তাহলে নতুন আইনে কমিশনের ক্ষমতা কি বাড়ছে না? বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, কোন ক্ষমতা বাড়ছে আর কোথায় তা আটকে রাখা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
শৃঙ্খলা বাহিনী বাদে অন্য অভিযোগের ক্ষেত্রে খসড়ার ১৩ ধারায় কমিশনের ক্ষমতা আগের চেয়ে বিস্তৃত হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে কিংবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে কমিশন। অভিযোগ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সেটি আমলে নেওয়া হবে কি না, জানাতে হবে সিদ্ধান্ত। তদন্ত কর্মকর্তাকে সাধারণভাবে তিন মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
তদন্তের প্রয়োজনে সাক্ষী তলব, দলিল ও প্রমাণ চাওয়া এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সুযোগ থাকছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা কিংবা তদন্ত প্রতিবেদন আদালত বা উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো যাবে। বিভাগীয় বা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার সুপারিশও করা যাবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারবে কমিশন; অনাদায়ি ক্ষতিপূরণ আদালত বা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আদায়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এসব পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কমিশনের কার্যকারিতার আসল পরীক্ষাটা তো সাধারণ অভিযোগে নয়। রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা নিরাপত্তা বাহিনী—যখন কাঠগড়ায়, তখন কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে সত্য খুঁজে বের করতে পারে, সেখানেই তার বিশ্বাসযোগ্যতার আসল পরীক্ষা। আর ঠিক সেই জায়গাতেই নতুন আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
স্বাধীনতার প্রথম পরীক্ষা নিয়োগে
খসড়ায় কমিশনকে ‘স্বাধীন প্রতিষ্ঠান’ বলা হয়েছে। কিন্তু আইনে ‘স্বাধীন’ ঘোষণা করে দিলেই কি একটি প্রতিষ্ঠান স্বাধীন হয়ে যায়? স্বাধীনতার প্রথম পরীক্ষা তো নিয়োগেই।
খসড়া অনুযায়ী কমিশন গঠিত হবে একজন চেয়ারপারসন ও চারজন সার্বক্ষণিক কমিশনারকে নিয়ে। পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজন থাকতে হবে নারী। নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থী মিললে তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
চেয়ারপারসন ও কমিশনার বাছাই করবে ৯ সদস্যের একটি কমিটি, যার সভাপতি জাতীয় সংসদের স্পিকার। সদস্য হিসেবে থাকবেন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এর বাইরে থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মনোনীত একজন অধ্যাপক আর রাষ্ট্রপতি মনোনীত দুজন নাগরিক প্রতিনিধি—যাঁদের একজন মানবাধিকার বিষয়ে এবং অন্যজন নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
কমিটিতে মানবাধিকারে অভিজ্ঞ তিনজন থাকলেও ৯ সদস্যের মধ্যে স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব—অন্তত পাঁচজনই সরাসরি রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য আর স্বাধীন সদস্যরা একজোট হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারবেন না। কোরাম হবে ৫ সদস্যে, সিদ্ধান্ত হবে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে; ভোট সমান হলে সভাপতির হাতে থাকবে নির্ণায়ক ভোট। ফলে স্বাধীন বা বিরোধী প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতেও নিয়োগের সুপারিশ হয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খসড়ায় গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন ও মনোনয়ন আহ্বান, তথ্য যাচাই এবং যোগ্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির বিধান আছে। প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজনের নাম পাঠাতে হবে রাষ্ট্রপতির কাছে। কিন্তু আবেদনকারীদের নাম, সংক্ষিপ্ত তালিকা, সাক্ষাৎকার কিংবা চূড়ান্ত সুপারিশ প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বাছাই কমিটি নিজের কার্যপদ্ধতি ঠিক করে নিতে পারবে নিজেই।
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বাছাই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক; সেখানে সাংবাদিক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিও ছিলেন। নতুন খসড়ায় বিচারকের নেতৃত্ব বাদ দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে স্পিকার, দুই মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের প্রভাব।
বিজ্ঞাপন
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছেন, বাছাই কমিটিতে একজন সদস্য বাদে বাকি প্রায় সবাই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রপতি-সংশ্লিষ্ট। এভাবে কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, যেসব সংস্থার বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে তদন্তের ব্যবহারিক পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও কার্যত তাদেরই হাতে থাকছে। ধারা ও বিধানগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতেই সুরক্ষা পায়। মৌলিক দিক থেকে ২০০৯ সালের আইনের সঙ্গে এর তেমন পার্থক্য নেই বলেই মনে করেন তিনি।
এই বক্তব্যের পাশে নিয়োগকাঠামোটি রাখলে প্রশ্নটি আরও পরিষ্কার হয়—কমিশন যাদের বিরুদ্ধে কাজ করবে, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোরই যদি প্রভাব থাকে কমিশনের নিয়োগে, তাহলে পরে সেই প্রতিষ্ঠান তাদের বিরুদ্ধে কতটা স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারবে?
‘আর্থিক স্বাধীনতা’ আসলে কতটা
খসড়ার ৩৫ ধারার শিরোনাম ‘কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা’। শিরোনামটি আশা জাগায়। কিন্তু ভেতরের বিধান পড়লে প্রশ্ন থেকে যায়, স্বাধীনতাটা আদতে কতখানি।
প্রতি অর্থবছরে কমিশনের ব্যয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ করবে সরকার। অনুমোদিত ও নির্ধারিত খাতের মধ্যে সেই অর্থ খরচ করতে কমিশনকে সরকারের পূর্বানুমোদন নিতে হবে না। কিন্তু কমিশনের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী সরকার অর্থ দিতে বাধ্য থাকবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরাদ্দ কত হবে, ঠিক করবে সরকারই। আবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের সময়ে সময়ে জারি করা বিধিবিধানও প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বরাদ্দ পাওয়ার পর নির্ধারিত খাতে খরচের স্বাধীনতা থাকলেও কমিশন কত টাকা পাবে আর কোন কোন খাতে খরচ করতে পারবে, তার নিয়ন্ত্রণ থাকছে সরকারের হাতেই।
দক্ষিণ এশিয়ার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের বাংলাদেশ ব্যুরোর প্রধান সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৯ সালের আইনে বিদেশি অর্থ ব্যবহারের কোনো সুযোগই কমিশনের ছিল না; এবার সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবু অর্থের জন্য সরকারের ওপর নির্ভরতা থেকেই গেল।
অর্থের ওপর নির্ভরতা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের বেলাতেই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। কারণ যার বিরুদ্ধে তদন্ত, সেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোই যদি ঠিক করে দেয় প্রতিষ্ঠানটির অর্থনৈতিক সক্ষমতার বড় অংশ, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
জনবলেও সরকারের ছায়া
অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে কমিশন। কিন্তু নির্বাহী পরিচালকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও চাকরির শর্ত প্রবিধানের মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হলেও প্রবিধান হওয়ার আগ পর্যন্ত সেসব ঠিক করবে সরকার। কমিশনের মোট জনবলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রেষণে নেওয়া যাবে। এমনকি কমিশনের নিজস্ব তদন্ত দলেও প্রেষণে সরকারি কর্মকর্তা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়—যেসব সরকারি সংস্থার বিরুদ্ধে কমিশনকে তদন্ত করতে হতে পারে, সেই প্রশাসনেরই কর্মকর্তাদের ওপর যদি কমিশনের তদন্ত দলকে নির্ভর করতে হয়, তাহলে তদন্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
বিজ্ঞাপন
কমিশন প্রবিধান তৈরি করতে পারলেও সরকারি গেজেটে তা প্রকাশ করবে সরকার। আর্থিক ক্ষমতা অর্পণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে সরকারের জারি করা বিধান। অর্থাৎ আইনে স্বাধীনতার ঘোষণা আছে; কিন্তু নিয়োগে সরকারের প্রভাব, অর্থে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, জনবলে সরকারি কর্মকর্তার প্রেষণ আর বিধি কার্যকরে সরকারের ভূমিকা—স্বাধীনতার চারটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতেই থেকে যাচ্ছে নির্বাহী বিভাগের উপস্থিতি।
‘এ’ মর্যাদার পথ
বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন এখন গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অব ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ইনস্টিটিউশনস বা গ্যানরির ‘বি’ মর্যাদায় আছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের স্বীকৃত প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে কমিশনের সামঞ্জস্য আংশিক। ‘এ’ মর্যাদা না পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই চিহ্নিত হয়ে আসছে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের সীমাবদ্ধতা, নিয়োগে সরকারের প্রভাব এবং পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাব। নতুন আইন যদি সেই পুরোনো সমস্যাগুলোর মূল জায়গাগুলোই বহাল রাখে, তবে ‘এ’ মর্যাদার পথে অগ্রগতি হবে কী করে?
২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে মেলালে প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়। ওই অধ্যাদেশ ঘিরে নাগরিক সমাজে কমিশনকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নতুন খসড়ায় পিছিয়ে যাচ্ছে। টিআইবিও বলেছে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনকে যে পর্যাপ্ত এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল, মূলত সেটিই বজায় রাখা উচিত ছিল।
নতুন আইনে কমিশনের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, ক্ষতিপূরণ, অন্তর্বর্তী সুরক্ষা এবং আটক রাখার স্থান পরিদর্শনের ক্ষমতা বাড়ছে—এগুলো ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ যেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠে, তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা থাকছে না। নিয়োগে ক্ষমতাসীনদের সংখ্যাগত প্রভাব, বাজেটে সরকারের নিয়ন্ত্রণ, প্রেষণে সরকারি কর্মকর্তা নেওয়ার সুযোগ আর বিধিবিধানে নির্বাহী বিভাগের ভূমিকা—সবই বহাল থাকছে। ফলে কমিশন কাগজে স্বাধীন হলেও কার্যক্ষেত্রে কতটা স্বাধীন হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।