সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারি দলের সফলতার দাবি নাকচ করে দিয়েছে বিরোধী দল। তাদের বক্তব্য, জনজীবনের সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে সরকারকে সফল বলার সুযোগ নেই।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেকারত্বের আশঙ্কা এবং গুম ও হত্যার মতো ঘটনাকে সরকারের ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বিরোধী দলের প্রশ্ন — জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকারই যদি নিশ্চিত করা না যায়, তবে কিসের সফল সরকার?
বুধবার বিকেলে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বাসভবনে বৈঠকে বসেন ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি জানান, বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আন্দোলন জোরদারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, দেশে জনদুর্ভোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। ‘জুলাই সনদ’ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করায় সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বৈঠকে পরদিনের সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের ভূমিকা, জোটের ঘোষিত কর্মসূচি ও তার প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
হামিদুর রহমান আযাদ আরও বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে জনজীবনে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের অব্যবস্থাপনা ও দলীয়করণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। তাঁর দাবি, এসব কারণেই দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন পড়েছে নতুন সংকটের মুখে।
গুমের শিকার পরিবার নিয়ে কর্মসূচি
৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে নতুন কর্মসূচির কথাও জানান তিনি। ওই দিন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হবে সংসদমুখী পদযাত্রা; ১১ দলের সমর্থনে বেলা ৩টায় রাজধানীর শাহবাগ থেকে শুরু হবে কর্মসূচিটি। পদযাত্রা শেষে পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে সংসদের স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সরকারের সাফল্যের দাবি প্রত্যাখ্যান
সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে ১১ দলের পক্ষ থেকে সরকারকে ব্যর্থ বলার সমালোচনা করেছিলেন সরকারি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব; সে প্রসঙ্গেও কথা বলেন হামিদুর রহমান আযাদ। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংকট, কারখানা বন্ধ হওয়া, বেকারত্ব, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা — এসবকেই সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখতে হবে।
জামায়াতের এই নেতার দাবি, গ্যাস-সংকটে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; এতে ক্রয়াদেশ চলে যাচ্ছে অন্য দেশে, চাপ তৈরি হচ্ছে অর্থনীতিতে। তাঁর প্রশ্ন — এসব সরকারের ব্যর্থতা নয় কেন?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি গুম ও হত্যার বিভিন্ন পরিসংখ্যান উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, প্রায় ছয় মাসে অপহরণ বা গুমের শিকার হয়েছেন ৫১২ জন, আর হত্যার শিকার প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন। তবে এসব পরিসংখ্যানের কোনো উৎস তিনি উল্লেখ করেননি।
জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার এবং জনজীবনের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো সরকারকেই সফল বলা যায় না বলে মনে করেন তিনি।
‘জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন ২০২৬-এর খসড়ায় আগের অধ্যাদেশের তুলনায় মানবাধিকার সুরক্ষা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগের অধ্যাদেশে কমিশনের নিজস্ব তদন্তের যে ক্ষমতা ছিল, নতুন আইনে তা রাখা হচ্ছে না। যাঁদের বিরুদ্ধে গুম বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, তাঁদেরই তদন্তের দায়িত্ব দিলে সেই তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। এমন আইন কার্যকর হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। কমিশনের সদস্য বাছাইয়ের প্রক্রিয়াতেও সরকারি বা নির্বাহী বিভাগের প্রাধান্য রাখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়টি জুলাই সনদের অঙ্গীকারের অংশ ছিল বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলেরই প্রাপ্য। বিষয়টি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে এখনই তা বাস্তবায়ন সম্ভব, অথচ সরকার ‘না’ বলছে। তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের শর্তের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদকে যুক্ত করে বিরোধী দলকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে শুরু হবে লংমার্চ, পর্যায়ক্রমে তা যাবে অন্য বিভাগেও; পরে ঢাকায় হবে মহাসমাবেশ।
দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বিডিপির চেয়ারম্যান এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম (চান), জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন ও এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ অন্য নেতারা।