রাজনীতি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানালেন স্পিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৮ দুপুর
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উত্তপ্ত সংসদ, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানালেন স্পিকার
ছবি: প্রথম আলো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরুর দিনেই উত্তাপ ছড়াল সংসদ কক্ষে। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।

বিরোধী দলের সদস্যদের অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। এ নিয়ে তাঁরা তীব্র আপত্তি জানান। আপত্তি, হইচই আর হট্টগোলে প্রায় ১০ মিনিট সংসদ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিরোধীদের চাপের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও উত্তেজনা তাৎক্ষণিকভাবে থামেনি। বারবার চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কিছুটা চিন্তিত।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার বিকেলে, সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্ব চলাকালে।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ একটি সম্পূরক প্রশ্ন তুলতে গিয়ে অভিযোগ করেন, প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সংসদ সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন, এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানেই যাচ্ছেন সেখানে তাঁকে ঘিরে ভুয়া স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। তাঁর আরও অভিযোগ, বিরোধী দলের সদস্যের ওপর হামলার মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ধরা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা জানতে চান তিনি।

জবাব দিতে উঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শুরুর এক মিনিট তিনি অন্যমনস্ক ছিলেন। তাই প্রশ্নটি আবার করার অনুরোধ জানান তিনি।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ তখন প্রশ্নটি দ্বিতীয়বার করেন।

এবার জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।’

এই মন্তব্যেই আপত্তি জানান বিরোধী দলের সদস্যরা। তাঁরা হইচই শুরু করেন, অনেকে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।

এর আগে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো বুঝতে পারিনি।’ সেবার কয়েকজন মৃদু আপত্তি জানিয়েই থেমেছিলেন, কিন্তু শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাবের পর বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক বেশি তীব্র।

আপত্তির মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, তিনি কাউকে উদ্দেশ করে কথাগুলো বলেননি। এরপরও হট্টগোল না থামায় তিনি স্পিকারের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আমি আপনার শেল্টার (আশ্রয়) চাইছি।’

বিরোধীদের হইচইয়ের মধ্যেই একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা জানান। তাতেও প্রতিবাদ থামেনি। শেষ পর্যন্ত হট্টগোলের মধ্যে কথা বলতে না পেরে তিনি আসনে বসে পড়েন।

এদিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের সদস্যদের বারবার আসনে বসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার অনুরোধ জানাতে থাকেন।

একপর্যায়ে স্পিকারকে বলতে শোনা যায়, ‘মাননীয় সদস্যবৃন্দ, হয়েছে তো, অনেকক্ষণ বলেছেন। এখন আপনারা অনুগ্রহ করে বসুন। অনুগ্রহ করে নিজের আসনে বসুন।’

তবে বিরোধী দলের কেউই স্পিকারের অনুরোধ আমলে নেননি, হইচই চলতেই থাকে। তখন তিনি বলেন, ‘এইভাবে ঢালাও না বলে মাইকে বললে তো সবাই শুনতে পায়। আপনাদের সুযোগ দেওয়া হবে। যখন সুযোগ পাবেন, মাইকে বলবেন।’

স্পিকার আরও বলেন, ‘এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছেমতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ (সমালোচনা) করতে পারছেন। মাননীয় সদস্যবৃন্দ, বসুন প্লিজ। অপেক্ষা করুন।’ একপর্যায়ে তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে বলার সুযোগ দেওয়া হবে।

হইচইয়ের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করলে স্পিকার তাঁকে নিজের দিকে তাকিয়ে কথা বলার আহ্বান জানান। বিরোধী দলের সদস্যরা তখনো দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছিলেন। তাঁদের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধী দলের নেতাকে দেব।’

হট্টগোলের মধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোথায় ছিনতাই হয়েছে বা কোন আসামি গ্রেপ্তার হয়নি — এসব ঢালাওভাবে না বলে সুনির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা উচিত। সে কারণেই তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, এটি জাতীয় সংসদ।

এরপর স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে বক্তব্যের সুযোগ দেন। শুরুতেই তিনি বলেন, ‘আমাকে আগে সুযোগ দিলে ওনার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কথাটা শুনতে পেতাম।’

এ সময় সরকারি দলের কয়েকজন সদস্য বিরোধীদলীয় নেতার উদ্দেশে কিছু বলতে শুরু করেন।

জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘বক্তব্য কি আপনি দেবেন, না আমি দেব? আপনি দেন।’

স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এটা অশুভ। আমার বক্তব্যের সময় যদি এভাবে কমেন্টস করা হয়, তাহলে আমার এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।’

স্পিকার তখন তাঁকে বক্তব্য চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি সম্মানিত সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, আজকে নতুন করে তিনি এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেন নাই। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তিনি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন সবাইকে। উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সেই দুঃসাহস এখানে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন।’

এ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন, ওখানে যার পছন্দ গিয়ে ভর্তি হবে ওনার লেকচার শুনবে।’

একই বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুবার আক্রমণ করেছেন উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার সঙ্গীরা তো মনে করে, আমি নিজেও মনে করি যে এইটা কালচারাল না, এইটা পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম। এটা হওয়া উচিত না।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ ও তাঁর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এইটুকু করা হলে বিরোধী দল সংসদ কক্ষে থাকবে; না হলে অপমান নিয়ে সেখানে বসার প্রশ্নই ওঠে না।

বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন জানান।

পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, জাতীয় সংসদে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে সবাই কাজ করছেন। কার্যপ্রণালি বিধি না মানলে সংসদ কার্যকর থাকে না।

তিনি বলেন, ‘আমি গভীর দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, ক্রমেই কিছু কিছু সদস্যের মধ্যে আমি অসহিষ্ণুতা লক্ষ করছি। জাতীয় সংসদ পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এখানে প্রত্যেকেরই কথা বলার স্বাধীনতা আছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পরীক্ষা করে অসংসদীয় কিছু পাওয়া গেলে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে জানিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশে স্পিকার বলেন, ‘কিন্তু কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করবেন না। আপনারা যে কয়জন আছেন, তার দ্বিগুণ-তিন গুণ এ পাশে (সরকারি দলে) আছে। সুতরাং শব্দ করে এর বাণীকে স্তব্ধ করা যাবে না। আমাকে সংসদ পরিচালনা করতে দিন।’

স্পিকারের বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আজকের বিষয়টা একবারে স্পষ্ট। এটা তো আর পরীক্ষা করে দেখার কোনো বিষয় নেই।’ সংখ্যার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শেষ দিকে স্পিকার বলেছেন এই দিকের চেয়ে ওই দিকে তিন গুণ সদস্য আছেন — কথাটি তাঁর ভালো লাগেনি। তিনি জানান, সংসদকে কোনো গুণে বিভক্ত করার পক্ষে তিনি নন; শুরু থেকেই তাঁরা বলে আসছেন, ভালো কাজে সবাই এক হয়ে কাজ করবেন, আর অন্যায় হলে প্রতিবাদ জানাবেন।

এরপর সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্য শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। আজকে যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করেছি, এটি সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়। অনেক কষ্টের পর গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। এই গণতন্ত্র যাতে বহাল থাকে, সে জন্য সংসদের প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব এখানে রয়েছে।’

সূত্র: প্রথম আলো

৭ বার দেখা

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

আপনার মতামত সম্পাদক অনুমোদনের পর প্রকাশিত হবে।

সম্পর্কিত খবর

পরের খবর

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া নির্ভর করছে সদস্যদেশগুলোর ইচ্ছার ওপর

মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া নির্ভর করছে সদস্যদেশগুলোর ইচ্ছার ওপর