আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় অনেকেই বিষয়টিকে দেখেন নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে। কিন্তু রিটার্নে দেওয়া তথ্যই করদাতার আয়, ব্যয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় ও পরিশোধিত করের হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি অনেকেই জানেন না, কিংবা গুরুত্ব দেন না। ফলে সামান্য ভুল তথ্য বা এক জায়গার সঙ্গে অন্য জায়গার তথ্যের অসঙ্গতি পরে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে অনলাইনে ই-রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করে সাবমিট করার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
২০২৬-২০২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন নিয়ে এনবিআরের নতুন এফএকিউতে করদাতাদের নানা সাধারণ ভুল ও সেগুলো এড়ানোর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। নির্দেশনায় বারবার বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে রেখে সতর্কতার সঙ্গে তথ্য দিতে হবে — কারণ ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যে রিটার্ন সঠিকভাবে পূরণ না-ও হতে পারে।
ই-রিটার্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো আয় ও কর পরিশোধের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা। এফএকিউতে ব্যাংক টিডিএস-সংক্রান্ত একটি সমস্যার উদাহরণও দেওয়া হয়েছে — ইনকাম সেকশনে এক ধরনের তথ্য আর ট্যাক্স অ্যান্ড পেমেন্ট অংশে অন্য তথ্য দিলে ‘ডিকলেয়ার্ড ব্যাংক টিডিএস ইজ নট ফাউন্ড’ কিংবা ব্যাংক টিডিএস ঘোষিত আয়ের তুলনায় বেশি দেখানোর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এনবিআরের পরামর্শ, দুই জায়গায় প্রকৃত তথ্য একইভাবে দিতে হবে; প্রয়োজনে ই-রিটার্ন লেজারের ‘সিঙ্ক ফ্রম ইনকাম’ সুবিধা ব্যবহার করেও তথ্য মিলিয়ে নেওয়া যায়।
অনেক করদাতা মনে করেন, আগের বছর সম্পদের তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে পরের বছর আর দেওয়ার দরকার নেই। বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। এনবিআর জানিয়েছে, আগের বছরের সম্পদ-দায় অংশের তথ্য ই-রিটার্নের অটোফাইল অপশন দিয়ে আনা যায়; এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ যোগ, বাদ বা সংশোধন করা যায়। তবে আগের বছর যেসব সম্পদ নগদায়ন বা হস্তান্তর হয়ে গেছে, সেগুলো বাদ দিয়েই অবশিষ্ট সম্পদ চলতি বছরের রিটার্নে দেখাতে হবে।
স্বর্ণসহ অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রেও বাজারমূল্য বসিয়ে দেওয়ার পরামর্শ নেই। এফএকিউ অনুযায়ী, আগের বছর যে মূল্য দেখানো হয়েছিল সেটিই বহাল রাখতে হবে; আর নতুন কিছু কেনা হলে দেখাতে হবে প্রকৃত ক্রয়মূল্য।
চাকরি, ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বা অন্য কোনো উৎস থেকে কর কাটা হয়ে থাকলে সেই তথ্য রিটার্নে সঠিকভাবে দেখানো জরুরি। একইভাবে গাড়ির অগ্রিম কর বা অন্য কোনো অগ্রিম কর পরিশোধ করা থাকলে ব্যবহার করতে হবে সঠিক লেনদেন আইডি, চালান বা প্রয়োজনীয় তথ্য।
এনবিআর বলছে, ই-রিটার্ন লেজারের তথ্য পূরণের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে রেখে সতর্কতার সঙ্গে তথ্য দিতে হবে; ভুল তথ্যে রিটার্ন অসত্য বা অসম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। (ই-রিটার্ন লেজার হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন আয়কর সিস্টেমে করদাতার পরিশোধিত কর, উৎসে কর্তিত কর (TDS) ও বিভিন্ন কর সমন্বয়ের হিসাব রাখার একটি ডিজিটাল খতিয়ান।)
একই আয়বর্ষে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে অনেকে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য দেন কিংবা মোট আয় ভুলভাবে বসান। এনবিআরের ২০২৬ সালের এফএকিউ অনুযায়ী, কর্মসংস্থান আয় অংশের ‘অ্যাড এমপ্লয়মেন্ট’ অপশন দিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানের চাকরি ও সংশ্লিষ্ট আয় আলাদাভাবে যোগ করা যায়। একইভাবে চিকিৎসক বা আইনজীবীর মতো পেশাজীবীদের আয়ও সঠিক খাতে দেখানো গুরুত্বপূর্ণ; তাঁদের পেশাগত আয় দেখাতে হবে বিজনেস/প্রফেশনাল ইনকাম-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট অংশে।
রিটার্ন জমার আগে তাড়াহুড়ো না করে প্রতিটি তথ্য একবার যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। ই-রিটার্নের ‘রিটার্ন ভিউ’ অপশনে পুরো রিটার্ন দেখা যায়; সেখানে ভুল তথ্য গেছে কি না পরীক্ষা করে প্রয়োজনে সংশোধনের সুযোগও রয়েছে।
এনবিআর জানিয়েছে, চাইলে করদাতা ধাপে ধাপে তথ্য পূরণ করে সেভ করে রাখতে পারেন, পরে সময় নিয়ে সব যাচাই করে রিটার্ন সাবমিট করতে পারেন।
সাবমিট করার পর ভুল ধরা পড়লেও বিষয়টি একেবারে শেষ হয়ে যায় না। ২০২৬ সালের ই-রিটার্ন এফএকিউ অনুযায়ী, অনলাইনে দাখিল করা রিটার্নে ভুল থাকলে দাখিলের ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন দেওয়া যাবে — তবে তা একবারই।
তাই রিটার্ন জমার আগে আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায়, টিডিএস, অগ্রিম করসহ সব তথ্য প্রমাণপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। এনবিআরের বর্তমান এফএকিউ অনুযায়ী, ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, যদিও নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণি এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রয়েছে।