বিশ্ববাজারে জ্বালানির চড়া দামের কারণে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে গুনতে হয়েছে আগের বছরের দ্বিগুণ অর্থ। এই খাতে মোট আমদানি ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। জ্বালানির এই বাড়তি খরচের ধাক্কাতেই দেশের সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বেড়েছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেশি। তথ্যগুলো পাওয়া গেছে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে।
তবে জ্বালানির পেছনে দ্বিগুণের বেশি অর্থ ঢালার পরও দেশের ডলারের বাজার প্রায় সারা বছরই স্থিতিশীল ছিল। এর মূল কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের মন্দাভাবের পাশাপাশি ভোগ্যপণ্য, শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামালের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়া। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়নি, ডলারের বাজার শান্ত থেকেছে এবং রিজার্ভও বেড়েছে। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতাই এখন ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতার বড় কারণ।
তাঁদের মতে, অর্থনীতিতে এই ধীরগতি না থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার চাপে ২০২২ সালের মতোই ডলারের দামে অস্থিরতা দেখা দিত, আর তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ত নানা খাতে। কিন্তু ধীরগতি ডলারের বাজারকে স্থিতিশীল রাখলেও পরিস্থিতিটা মোটেই স্বস্তির নয়। কারণ, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় কর্মসংস্থানও থমকে গেছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণ খরচের পরও আমরা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছি না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে মন্দাভাব থাকায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পরও ডলার ও রিজার্ভে বড় ধাক্কা লাগেনি। পাশাপাশি বিদেশি ঋণছাড় ও প্রবাসী আয়ে গতি ছিল, এ কারণে খুব বেশি সমস্যা হয়নি। তবে আগামী দিনে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বাড়বে। অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির চাপও বিদ্যমান। তাই ডলার ও রিজার্ভের ওপর যাতে নতুন করে চাপ তৈরি না হয়, সে জন্য এখনই কৌশলগত প্রস্তুতি নিতে হবে।’
খরচ কতটা বেড়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে, বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট আমদানি খরচ দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খরচ হয়েছিল ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি খরচ বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার বা ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু অপরিশোধিত জ্বালানি, পেট্রোলিয়াম, তেল ও লুব্রিকেন্ট আমদানিতেই গেছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার; আগের অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল ৫ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের ১২ মাসের মধ্যে আগস্ট, অক্টোবর ও নভেম্বর—এই তিন মাসে আমদানি কমলেও বাকি ৯ মাসে খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জ্বালানি আমদানিতে খরচ ছিল ৫২ কোটি ডলার, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে হয় ৭৩ কোটি ডলার। গত জানুয়ারিতে এই খাতে খরচ হয় ৭০ কোটি ডলার, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০ কোটি ডলার। গত এপ্রিলে খরচ দাঁড়ায় ১৩৪ কোটি ডলারে, আগের বছরের এপ্রিলে যা ছিল ৩৫ কোটি ডলার। আর গত জুনে খরচ হয় ১৬০ কোটি ডলার, আগের বছরের জুনে যা ছিল মাত্র ২৬ কোটি ডলার।
আগের অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণ খরচের পরও আমরা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছি না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে মন্দাভাব থাকায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পরও ডলার ও রিজার্ভে বড় ধাক্কা লাগেনি।
— মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি
ডলার ও রিজার্ভ পরিস্থিতি
জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়লেও প্রবাসী আয়ের ঊর্ধ্বগতি আর বিদেশি ঋণছাড়ের কারণে রিজার্ভ কিংবা ডলারের দামে সেই বাড়তি খরচের বড় প্রভাব পড়েনি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম ৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম হিসাবের বাইরে সাধারণ হিসাবে মোট রিজার্ভের পরিমাণ আরও কিছুটা বেশি—৩৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।