১৩ বছর লম্বা সময় — দিনের হিসাবে ৪ হাজার ৮৩৪ দিন। তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ছিল না। সে বছরই মারা যান নেলসন ম্যান্ডেলা, স্মার্টওয়াচ পৌঁছাতে শুরু করে মানুষের ঘরে ঘরে, ইতিহাসের প্রথম দক্ষিণ আমেরিকান পোপ পায় পৃথিবী — আর রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে চলে যান জোসে মরিনিও।
এই সময়ে পৃথিবী অনেকটা বদলে গেলেও মরিনিও পাল্টাননি এতটুকু। ১৩ বছর আগে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ডাগআউটে যেভাবে অস্থিরচিত্তে পায়চারি করতেন, গতকাল রাতেও দেখা গেল ঠিক সেভাবেই। রিয়াল সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কেও বদল আসেনি — এত দিন পর ফেরার ম্যাচে যেমন দুয়ো শুনেছেন, তেমনি ৪-১ গোলের জয়ে ভিজেছেন করতালির বৃষ্টিতেও।
ওহ, বলাই হয়নি — লা লিগার এই ম্যাচে স্বাগতিকদের প্রতিপক্ষ ছিল রিয়াল সোসিয়েদাদ। আসলে কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আর জুড বেলিংহামরা যেভাবে খেললেন, তাতে দর্শকদের কেউ কেউ প্রতিপক্ষের নাম ভুলে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। বলা যায়, মরিনিওর প্রত্যাবর্তনকে স্মরণীয় করতে রীতিমতো নৈবেদ্যই সাজিয়েছে রিয়ালের এই ‘ত্রিফলা’ আক্রমণভাগ। এমবাপ্পে করেছেন হ্যাটট্রিক; ভিনিসিয়ুস একটি গোল করার পাশাপাশি বানিয়েছেন আরেকটি, আর বেলিংহাম বানিয়েছেন দুটি।
একে বার্নাব্যুতে মৌসুমের প্রথম ম্যাচ, তার ওপর ‘আইসিং অন দ্য কেক’ হয়ে এল মরিনিওর ফেরার উপলক্ষ। খেলা শুরুর আগে তাই ‘লাইট শো’তে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া হয় গ্যালারির দর্শকদের। এরপর মাঠে নেমে চোখ ধাঁধালেন এমবাপ্পেরা — তবে শুরু থেকেই নয়, আড়মোড়া ভাঙতে খানিকটা সময় লেগেছিল তাঁদের।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে আসে এমবাপ্পের প্রথম গোল। সেই চিরচেনা বক্সের ভেতর থেকে দুর্দান্ত ফিনিশ, উৎস ফেদে ভালভের্দের পাস। চার মিনিট পর লুকা সুসিচের গোলে সোসিয়েদাদ সমতায় ফিরলেও ম্যাচের বাকি গল্পটা পুরোপুরি রিয়ালের।
বেলিংহাম ও ভিনিসিয়ুসের পাস থেকে ৬০ ও ৮০ মিনিটে দুটি গোল করে রিয়ালের হয়ে নিজের ষষ্ঠ হ্যাটট্রিক তুলে নেন এমবাপ্পে। তবে শেষ গোলটির চেয়েও সুন্দর ছিল তার উৎস — ভিনির পাসটি। সোসিয়েদাদ ডিফেন্ডারের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কীভাবে তিনি বলটি বাড়ালেন, সেটাই বড় বিস্ময়। মাঝে ৬৮ মিনিটে বেলিংহামের পাস থেকে নিজের গোলটি করেন এই ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার।
এক যুগেরও বেশি আগে তিনটি ঘরোয়া শিরোপা জেতানো কোচের প্রত্যাবর্তন দেখতে বার্নাব্যুতে ছিল তিল ধারণের ঠাঁই নেই অবস্থা। মরিনিও নিজেও একটি মাইলফলক ছুঁয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখলেন — লা লিগায় ৫৮তম ‘হোম’ ম্যাচে এটি ছিল তাঁর ৫০তম জয়। এই পথে গোল পেয়েছেন ২০২টি। অর্থাৎ সোসিয়েদাদের বিপক্ষে ৫০তম লিগ জয়ের পাশাপাশি দুই শ গোলের মাইলফলকও পেরোলেন তিনি।
তবে লিগে টানা দ্বিতীয় জয়ের পর এসবের কিছু নিয়েই কথা বলেননি মরিনিও। তাঁর কণ্ঠে ঝরল কেবল এমবাপ্পের প্রশংসা, ‘এই ছেলেটি অবিশ্বাস্য। আমি দেখতে পাচ্ছি, রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইতিহাস গড়তে সে ভীষণ আগ্রহী। আর কিলিয়ান যতই কিলিয়ান হোক না কেন, দলের কথা না বলাটাও আমার জন্য খুব কঠিন।’
সেটাই স্বাভাবিক — দলে তারকা তো কেবল এমবাপ্পেই নন, আর ফুটবল খেলাটাও দলীয়। তবু পরের প্রশ্নটিও এল তাঁকে নিয়েই। এ মৌসুমে ফরাসি ফরোয়ার্ডের কাছে কত গোল চান কোচ? উত্তর, ‘সেটা ৬০, ৪০ কিংবা ৫০ হতে পারে—আমি জানি না। ট্রফিসহ ৪০ গোলেই আমি সন্তুষ্ট। কিংবা অনেক পরিশ্রমের ৪০ গোল। দলের ভেতর সে দায়িত্ব নিচ্ছে, ছুটি থেকে দুই দিন আগেই ফিরে এসেছে। আজ (গতকাল রাতে) তাকে ৯০ মিনিট মাঠে রেখেছি। আমার তো মনে হয়েছিল সে চার গোল করে ফেলবে।’
রিয়াল গোল পাওয়ার আগে প্রথমার্ধে কিছুটা কঠিন সময় কেটেছে মরিনিওর — গ্যালারি থেকে শুনতে হয়েছে দুয়ো। দুয়োধ্বনি শুনেছেন ভিনিসিয়ুসও। তবে পাত্তা দেননি কোচ, ‘বার্নাব্যুকে আমরা জানি। খেলোয়াড়েরাও জানে...একটুখানি দুয়োতে কারও কোনো ক্ষতি হবে না।’